প্রকাশিত: ০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১৫:৩৬ (বুধবার)
সমন্বয়হীনতা, মবের শঙ্কায় ঢিমেতালে প্রচারণা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট জেলায় জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা প্রকাশ্যে প্রচারণায় পিছিয়ে রয়েছেন। অনেকটা নীরবে ঢিমে তালে প্রচারণা চালাচ্ছেন তারা। মনোনীত প্রার্থীরা এখনও জেলার নেতাদের নিয়ে বড় কোনো জমায়েত করতে পারছেন না। জেলার নেতৃবৃন্দদের সঙ্গে এমপি প্রার্থীরা কোনো সমন্বয় করছেন না বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র। পাশাপাশি প্রার্থীরা ব্যয় কমাতেও জেলার নেতাদের কাছে ডাকছেন না বলে জানা গেছে। অন্যদিকে প্রকাশ্যে প্রচারণায় গেলে পলাতক আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ ট্যাগ দেওয়ার ভয়-আশঙ্কা থেকেই সিলেটে অনেকটা নীরবে ঢিমেতালে প্রচারণা করছে জাপা। 


জাপার একাধিক সূত্র জানায়, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছিল, জেলার সকল নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে এমপি প্রার্থীরা প্রচারণা চালাবেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় নির্দেশনা মানছেন না মনোনীত প্রার্থীরা। তারা একা, গোপনে, নীরব প্রচারণা চালাচ্ছেন। ভোটের মাঠে খুব একটা তাদেরকে দেখা যাচ্ছে না। 


দলটির সূত্র বলছে, মাঠের প্রচারণায় জেলার নেতাদের নিতে গেলে টাকা খরচ করা লাগে। এই টাকা খরচ করতে চাচ্ছেন না সিলেটের তিনটি আসনের প্রার্থীরা। অবশ্য তাদের আরও একটা বড় সমস্যা হচ্ছে, ভোটের মাঠে বড় আকারে গণসংযোগে গেলে তাদেরকে ‘আওয়ামী দোসর’ ট্যাগের শিকার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। মব সন্ত্রাসের ভয়ও দলটি গোপনে নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম কারণ।  

জেলা জাপার সূত্র বলছে, এখনও কোনো প্রার্থী জেলার নেতাদের নিয়ে ‘নির্বাচনী সমন্বয় পরিচালনা কমিটি’ গঠন করেননি। অথচ কেন্দ্রীয় কমিটি বার বার বলেছে প্রার্থীরা যেন জেলার সমন্বয় পরিচালনা কমিটি নিয়ে মাঠে সরব থাকেন। কিন্তু জেলার নেতাদের প্রার্থীরা ডাকছেন না বলেই অভিযোগ উঠেছে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে। 

এর আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে থেকে একাধিক নির্বাচন করেছে জাপা। এসব নির্বাচনকে ‘রাতের ভোট ডাকাতি’ বলে থাকেন বর্তমান নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলো। এ অবস্থায় জাতীয় পার্টি নির্বাচনী এলাকায় বড় ও প্রকাশ্যে আসলে ‘আওয়ামী দোসর’ ট্যাগের কারণে মবের শিকার হওয়ার ঝুঁকি আছে। অন্যদিকে এমপি প্রার্থীরাও চাচ্ছেন না প্রকাশ্য প্রচারণার। তারা নীরবে ভোটের মাঠে প্রচরণা করে জয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। 

দলটির সূত্র জানায়, বিগত দিনের নির্বাচনে জাপা সিলেটের অনেক আসনে নির্বাচন করেছে। অভিযোগ রয়েছে, দলের মনোনীত প্রার্থী অন্য দলের প্রার্থীর সঙ্গে গোপনে সমঝোতায় আসন ছেড়ে দেন। আবার কোনো সময় প্রার্থীকে অন্ধকারে রেখে জেলার নেতারা অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে গোপনে দফারফা করেন। অতীতের এ রকম তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে জাপার এমপি প্রার্থীরা এবার বিশ^াস করছেন না জেলার নেতাদের। তাই জাপার প্রার্থীরা সিলেটে গোপনে একাই নিজের প্রচারণা নিজেই করে যাচ্ছেন। তবে, অনেক প্রার্থী আসনের উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে মাঠে কাজ করছেন বলে জানা গেছে। 

পরিসংখ্যান বলছে, ৯০ দশকের রাজনীতির মাঠে সিলেটে ছিল জাপার দুর্গ। জাপার চেয়ারম্যানও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সিলেটকে গুরুত্ব দিতে সিলেটে সফর করতেন। মুকিত খান, বেগম মমতাজ ইকবালসহ অনেকেই সিলেটের প্রভাবশালী এমপি ছিলেন দলটির। আওয়ামী লীগের সঙ্গে শরিক দলে থেকে পার্টির চেয়ারম্যান সিলেটের আসন ভাগাভাগি করতেন। কানাইঘাট ও বিশ^নাথ এ দুটি আসন সবসময় জাতীয় পার্টি পেতো। সিলেট-২ আসনে আওয়ামী লীগের সময় জাপার ইয়াহিয়া চৌধুরী ও সিলেট-৫ আসনে সেলিম উদ্দিন এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সিলেটে জাপার সেই জৌলুস আর নেই। তবু জাপা শেষমুহুর্তে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সিলেটে তিনজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। 

জাপা সূত্র বলছে, সিলেট-২ আসনে আওয়ামী লীগের ভোট ও সাবেক এমপি ইয়াহিয়া চৌধুরীর ভোট ব্যাংকের ওপর ভরসা করে মাঠে আছেন প্রার্থী মাহবুবুর রহমান চৌধুরী। শুধু তা-ই নয়, এখানে জামায়াতের জোট ও বিএনপির মধ্যে বিভেদকে কাজে লাগিয়ে এমপি হতে চান মাহবুব। 
সিলেট-৩ আসনে তিনবার এমপি ছিলেন জাপার মুকিত খান। সে কারণে, ওই আসনে এখনও অনেক পুরনো জাপা কর্মী আছেন। তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে আছেন জাপার হেভিওয়েট প্রার্থী আতিকুর রহমান আতিক। তিনি এই আসনে আতিক গোল্ডকাপের মাধ্যমে পূর্ব থেকেই হাটে-ঘাটে পরিচিত। এছাড়া আতিক একসময় ওই আসনে নৌকা নিয়েও নির্বাচন করেছেন। পূর্বে তিনি বিএনপির শফি চৌধুরী, মাহমুদুস সামাদ চৌধুরী কয়েসের সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। সে হিসেবে দক্ষিণ সুরমা এলাকার মানুষের কাছে তার পরিচিতি ভালো। এবার জামায়াত জোট ও বিএনপির প্রতিযোগিতায় সুযোগ নিতে চান আতিক।
সিলেট-৪ আসনে সাবেক ছাত্র সমাজের নেতা মুজিবুর রহমান ডালিম জাপার প্রার্থী। ওই আসনে জাপার এ প্রার্থী প্রান্তিক মানুষের কাছে দিনরাত ছুটে বেড়াচ্ছেন। তিনি জানান, আমাদের প্রচার প্রচারণা থেমে নেই। ঘুমব্যতিত সারাদিন আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে চষে বেরাচ্ছি। এ অঞ্চলের জনগণের মধ্যে সহমর্মীতা সম্প্রীতি রয়েছে। তাই প্রচারণাকালে কোন ধরণের ভয়ভীতি নেই।


সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমাননীগর) আসনে জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুর রহমান চৌধুরী বলেন,‘আমার উপজেলার নেতারা আমার সঙ্গে কাজ করছেন। এখনও নির্বাচনের মাঠে আমরা আশাবাদী জাতীয় পার্টিকে ভোটাররা জয়ী করবেন। আগে এ আসনে এমপি ছিলেন জাপার প্রার্থী।’
তবে প্রচারণায় সময়ে পলাতক আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ ট্যাগ দিয়ে মব সন্ত্রাসের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এ প্রার্থী।

সিলেট-৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিক বলেন, ‘জেলার সদস্য সচিব আমার প্রচারণা চালিয়েছেন। এ আসনে আমি প্রায় ৪০ বছর ধরে কাজ করছি। এখানকার মানুষেরা আমাকে চিনেন। আমার সঙ্গের অনেকেই এমপি হয়েছেন, আমি হতে পারিনি। আমার অনুরোধ থাকবে, এবার যেন তারা আমাকে সুযোগ দেন। এখনও আমাদের প্রচারণায় কোনো প্রতিবন্ধকতা আসেনি। আশা করবো, শেষমুহুর্ত পর্যন্ত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে।’

সিলেট জেলা জাতীয় পার্টির সদস্য সচিব আলতাফুর রহমান বলেন, ‘আমি জানি না, তাদের (জাপার প্রার্থী) প্রচারণায় কেন জেলার নেতাদের ডাকেন না। আমার জানামতে, এখনও সিলেটে জেলার নির্বাচনী সমন্বয় পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়নি। আমার মনে হয়, প্রার্থীরা একা-একাই তাদের প্রচারণা করছেন। আমাদের ডাকলে আমরা যেতাম। কেন ডাকছেন নাÑএটা তারাই ভালো বলতে পারবেন।’