প্রকাশিত: ০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১৫:২৫ (সোমবার)
গ্রামেও ভোটের উত্তাপ

# প্রচারে এগিয়ে বিএনপি-জামায়াত
# সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আর মাত্র ৬দিন বাকি। এরই মধ্যে সিলেটের ছয়টি সংসদীয় আসনে নগর ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনের আমেজ। জানুয়ারির ২২ তারিখ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হওয়ার পর ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সরগরম হয়ে উঠছে পুরো জেলা। শহরের ব্যস্ত মোড় থেকে শুরু করে গ্রামের কৃষকের উঠান, হাট-বাজার, চায়ের দোকান, সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নির্বাচন।


মাঠে একাধিক রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা থাকলেও বেশিরভাগ আসনে প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা। তাদের নেতাকর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতিতে গ্রাম-গঞ্জে প্রতিদিনই বাড়ছে নির্বাচনী তৎপরতা। কাগুজে পোস্টার বা প্লাস্টিকের ব্যানার না থাকলেও সাদা কাপড়ে কালো অক্ষরে লেখা ব্যানার ও ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে সড়ক, গাছ আর প্রবেশপথ। পাশাপাশি মাইক ব্যবহার করে গানে গানে ভোট চাওয়ার দৃশ্যও নজরে পড়ছে। ভোটের মাঠে প্রার্থীদের মুখে এখন প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি। নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও জনদুর্ভোগ লাঘবের নানা আশ্বাস তুলে ধরা হচ্ছে ভোটারদের সামনে। প্রার্থীরা ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাইছেন, জানাচ্ছেন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা।


তবে প্রচারণার উত্তাপের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও। গাছে ফেস্টুন টাঙানো, রঙিন ফেস্টুন ব্যবহার এবং সরকারি স্থাপনা কাজে লাগিয়ে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে একাধিক প্রার্থীর বিরুদ্ধে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিলেও পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না এসব অনিয়ম।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, সিলেট জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ৩৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ৩০ জন দলীয় এবং তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। অধিকাংশ আসনেই বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থীদের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে উত্তেজনা ও হিসাব-নিকাশ। শেষ পর্যন্ত কারা হাসবেন বিজয়ের হাসি, সে অপেক্ষায় এখন পুরো সিলেট।


এদিকে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে সিলেট জুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রতিটি আসনে মাঠে কাজ করছেন একাদিক ম্যাজিস্ট্যাট। এবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে সাত দিনের জন্য। ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে থাকবে। মাঠপর্যায়ে সেনাবাহীনি ও পুলিশের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। সেনাবাহীনির টহল নিয়মিত অব্যাহত রয়েছে, গত রোববার থেকে টহল শুরু করেছেন বিজিবি সদস্যরাও। নির্বাচনে সিলেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গায়ে থাকবে বডি-ওর্ন ক্যামেরা।


সিলেট-১ (সিটি কর্পোরেশন ও সদর) আসনে মোট আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর (ধানের শীষ), জামায়াতের মাওলানা হাবিবুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলনের হাফিজ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা), গণঅধিকার পরিষদের আকমল হোসেন (ট্রাক),  বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) সঞ্জয় কান্ত দাস (কাঁচি), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন (কাস্তে), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. শামীম মিয়া (আপেল) এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ-এর প্রনব জ্যোতি পাল (মই)। এ আসনে মোট ভোটার ৬লাখ ৮০ হাজার ৯৪৬ জন। এরমধ্যে পুরুষ ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৮৬, নারী ৩লাখ ২৭ হাজার ৭৭৪ জন এবং হিজড়া ১৩ জন।  ভোটকেন্দ্র  ২১৫টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ১২৬৬ টি। এ আসনে ধানের শীষ ও দাড়িপাল্লার মধ্যে দ্বিমূখী লড়াই হওয়ার আভাস পাওয়া গেছে।


সিলেট-২ (বিশ^নাথ -ওসমানী নগর) আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে রয়েছেন বিএনপির তাহসিনা রুশদীর লুনা (ধানের শীষ), ১০ দলীয় জোটপ্রার্থী খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ মুনতাছির আলী (দেওয়াল ঘড়ি), জাতীয় পার্টির অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা মুহাম্মদ আমির উদ্দিন (হাতপাখা), গণফোরামের মো. মুজিবুল হক (উদীয়মান সূর্য) । মোট ভোটার ৩ লাখ ৬৮  হাজার ৯৩২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭৯ জন এবং নারী ১ লাখ ৮০ হাজার ২৫৩ জন। ১২৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোটকক্ষ রয়েছে ৭৩৩টি। এ আসনে বিএনপির ইলিয়াসপত্নী লুনা ও ১১ দলীয় জোটপ্রার্থী খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ মুনতাছির আলীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। 


সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ) আসনে ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরমধ্যে দলীয় চারজন আর স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন দুইজন। বিএনপির আব্দুল মালিক (ধানের শীষ), ১০ দলীয় জোটপ্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু (রিকশা), জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের রেদওয়ানুল হক চৌধুরী (হাতপাখা), স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী (ফুটবল) ও মঈনুল বাকর (কম্পিউটার)। মোট ভোটার ৪ লাখ ১৬ হাজার। এরমধ্যে পুরুষ ২ লাখ ১১ হাজার ৭০৯ জন, নারী ২ লাখ ৪ হাজার ২৮৯ জন এবং হিজড়া ভোটার ২ জন। মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৫১ ও ভোটকক্ষের সংখ্যা ৮৫২টি। এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন দলীয় চারপ্রার্থী।


সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ-গোয়াইঘাট-জৈন্তাপুর) আসনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জয়নাল আবেদীন (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান, (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা সাঈদ আহমদ (হাতপাখা), গণঅধিকার পরিষদের জহিরুল ইসলাম (ট্রাক)।


মোট ভোটার ৫ লাখ ১২ হাজার ৯৩৩ জন। এরমধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৬৭ হাজার ১৩০ জন, নারী ২ লাখ ৪৫ হাজার ৮০২ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ জন। মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৭২ ও ভোটকক্ষের সংখ্যা ১০০৮টি। এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী।


সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনে দলীয় তিনজন ও স্বতন্ত্র একজনসহ মোট চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি জোটের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের উবায়দুল্লাহ ফারুক (খেঁজুরগাছ), ১০ দলীয় জোট প্রার্থী খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ আবুল হাসান (দেওয়াল ঘড়ি), বাংলাদেশ মুসলিম লীগের প্রার্থী মো. বিলাল উদ্দিন (হারিকেন), বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদ (ফুটবল)। মোট ভোটার ৪ লাখ ২৮ হাজার ৭৪৮জন। এরমধ্যে পুরুষ ২ লাখ ২১ হাজার ৩৫৭ জন ও নারী ২ লাখ ৭ হাজার ৩৯১ জন। মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৫৮ ও ভোটকক্ষের সংখ্যা ৯১৪টি। এ আসনে ত্রিমূখী লড়াইয়ে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন জমিয়তের উবায়দুল্লাহ ফারুক, খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ আবুল হাসান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদ।


সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ) আসনে দলীয় চারজন ও স্বতন্ত্র একজনসহ মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরী (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আবদুন নূর (লাঙ্গল), গণঅধিকার পরিষদের জাহিদুর রহমান (ট্রাক) এবং স্বতন্ত্রপ্রার্থী মো. ফখরুল ইসলাম (হেলিকপ্টার)। মোট ভোটার ৫ লাখ ৯ হাজার ৯৩জন। এরমধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫৬ হাজার ৯৩৮ জন ও নারী ২ লাখ ৫২ হাজার ১৫৫ জন। মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৯২ ও ভোটকক্ষের সংখ্যা ১০১৩টি। এ আসনে বিএনপির এমরান আহমদ চৌধুরী ও জামায়াতের মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

সিলেট মহানগরীর মদিনা মার্কেট এলাকার বাসিন্দা সেলাল আহমদ সিলেটের মানচিত্রকে জানান, বিএনপি ও জামায়াত, দুই প্রার্থীই শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তবে যিনি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব আশা দিতে পারবেন, শেষ পর্যন্ত তার পক্ষেই ভোট যাবে। 
সিলেট মহানগরীর টিলাগড় এলাকার রিকশাচালক মনির মিয়া বলেন, ‘আমরা রাজনীতি বুঝি না, বুঝি পেটের দায়। কাজের সুযোগ বাড়বে, এই বিশ্বাস যিনি দিতে পারবেন, তাকেই সমর্থন দেব।’


সিলেট-৩ আসনের দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার এলাকার বাসিন্দা গৃহবধূ নাসিমা বেগম বলেন, ‘আমরা চাই শান্তিপূর্ণ এলাকা আর সন্তানদের জন্য ভালো ভবিষ্যৎ। যে প্রার্থী নারীদের কর্মসংস্থান আর নিরাপত্তার কথা বলবে, মানুষ তাকেই সমর্থন দেবে।’


সিলেট- ৬ আসনের গোলাপগঞ্জের বাদেপাশা ইউনিয়নের আলমপাড়া গ্রামের ভোটার ও সাবেক শিক্ষক আজিজুর রহমান সিলেটের মানচিত্রকে বলেন, ‘এবার আমাদের এলাকায় ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কে জিতবে বলা কঠিন।’


সিলেট-২ আসনের বিশ^নাথ নতুন বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম সিলেটের মানচিত্রকে বলেন, ‘এবার ভোটাররা আগের চেয়ে অনেক হিসাব করে ভোট দেবে। শুধু দল নয়, প্রার্থী এলাকার জন্য কী করেছে আর কী করতে পারবেন, সেটাই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
সিলেট শহরের সুবিদবাজার এলাকার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী সাইদুর রহমান বলেন, ‘এবারের নির্বাচন খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। মানুষ আবেগ নয়, স্থিতিশীলতা আর অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেবে বলেই আমার মনে হয়।’


সিলেট জেলার রির্টানিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম সিলেটের মানচিত্রকে বলেন, ‘জনগণের আস্থা ফেরাতে শতভাগ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুত আছে।’