আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শেষ মুহুর্তের প্রচারণা জমে ওঠেছে। সিলেটের ৬টি আসনে প্রার্থীদের প্রচারণায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। প্রকাশ্যে প্রচারণায় বিএনপি এগিয়ে; জামায়াত ঘরে-ঘরে প্রচারণায় নীরবে মাঠ গোচাচ্ছে। শান্তিপূর্ণ প্রচারণায় সম্প্রীতি বজায় রেখেই সিলেটে এখনও দুই প্রধান দল বিএনপি-জামায়াত তাদের নির্বাচনী প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, সিলেটে ততই ভোটারদের দখলে জামায়াত-বিএনপির লড়াই তীব্র হচ্ছে।
সরেজমিনে জানা গেছে, সিলেট-১ আসনে খন্দকার মুক্তাদির সকাল থেকে রাত বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগ করছেন। তিনি নগরের পাড়া-মহল্লায় চষে বেড়াচ্ছেন। কোথায় পায়ে হেঁেট ভোটারদের কাছে ভোট চাচ্ছেন। সিলেট নগরের বিভিন্ন এলাকায় মুক্তাদিরের প্রচারণায় ছোট-ছোট বিশেষ গাড়ি সাজিয়ে মাইকে গান বাজিয়ে ধানের শীষের ভোট চাওয়া হচ্ছে। এদিকে, একই আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান হাবিব আগে থেকেই গোপনে মাঠ নিয়ন্ত্রণে আনার মিশনে নেমেছিলেন। এখন শেষ মুহুর্তে এসে তিনি প্রকাশ্যে প্রচারণায় নেমেছেন। তিনি নগরীর উপশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় মিছিলসহ গণসংযোগ করেছেন। প্রধান নির্বাচনী কার্যালয় ধোপাদিঘি এলাকায় মাইকে প্রচারণা চলছে জামায়াতের। নগরীর বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে জামায়াতের নারী সদস্যরা মহিলাদের ভোট টানতে গোপনে হাবিবের প্রচারণা চালাচ্ছেন।
নগর ঘুরে জানা গেছে, নগরীর চায়ের দোকানে ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনি আলাপের ঝড় ওঠেছে। এসব দোকানে প্রার্থীদের পক্ষে সমর্থকরা প্রচারপত্র বিতরণ করছেন। এসময় প্রার্থীদের পক্ষে চায়ের কাপে নির্বাচনি আলাপ জমেছে। এখন পর্যন্ত সিলেটে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা শান্তিপূর্ণ রয়েছে।
তোপখানা এলাকার বাসিন্দা চা বিক্রেতা এরশাদ আহমেদ বলেন,‘ এবারের নির্বাচনে সিলেটের পরিবেশ খুবই শান্তিপূর্ণ। এখানে রাজনৈতিক দলের মধ্যে সম্প্রীতি আছে। তাই কেউ কারও প্রচারণা নিয়ে কোনো বিতর্কে জড়ায়নি। আমার দোকানের সামনে বসেই বিভিন্ন লোক চায় খায়, আর নির্বাচন নিয়ে তাদের রসালো আড্ডা-গল্প জমায়। আমার খুবই ভালো লাগে।’
কুয়ারপারের বাসিন্দা মোমিন মিয়া বলেন,‘ সিলেট-১ আসনের দুই প্রার্থীর প্রচারণা খুব শান্তিপূর্ণ হচ্ছে। কোনো দলই প্রচারণা নিয়ে বাড়াবাড়ি করছেন না। শেষ পর্যন্ত এ সম্প্রীতি থাকবে কিনা এখনও নিশ্চিত না। আমার মনে হচ্ছে, নির্বাচনের দিন সিলেটের এ সম্প্রীতি না-ও থাকতে পারে।’
সিলেট-২ আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন বিএনপি নেতা ইলিয়াসপত্নী তাহসিনা রুশদীর লুনা। তিনি বিভিন্ন গ্রামে-গ্রামে উঠান বৈঠকে যাচ্ছেন। সমর্থকদের নিয়ে বিশ^নাথ-ওসমানী নগরের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছেন। পাশাপাশি লুনা দলের অভ্যন্তরের বিরোধ মেটাচ্ছেন। স্থানীয় বিএনপি নেতা সোহেল চৌধুরীর সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে তাকে নিয়ে প্রচারণা করছেন। তবে এখনও দলের যুগ্ম-মহাসচিব হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে প্রকাশ্যে বিরোধ মেটেনি। ইলিয়াস আলীর দুই ছেলেকে নিয়ে ভোট চাচ্ছেন লুনা। পাশাপাশি ইলিয়াস আলীর ভাই আসকিরকেও মাঠে নামিয়েছেন। তাই বিশ^নাথ-ওসমানী নগরে ধানের শীষের পক্ষে মানুষের আবেগ জাগাতে বিএনপির প্রচারণা তুঙ্গে বলেও মনে করেন এখানকার ভোটাররা। এদিকে, এ আসনে জামায়াতের ঐক্যে প্রার্থী হয়েছেন খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুনতাসির। তিনি খুব একটা প্রকাশ্যে ভোটের প্রচরাণা চালাচ্ছেন না। তবে তিনি নির্বাচনি মাঠে লুনার বিরুদ্ধে একজন শক্তিশালী প্রার্থী বলে জানা গেছে।
বিশ^নাথের হাবড়া বাজারের ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন বলেন,‘ বিশ^নাথ মানে পাড়া-মহল্লায় একটা নামÑ ইলিয়াস আলী। মানুষকে লুনাকে ভোট দিবে না, ভোট দিবে ইলিয়াস ভাইকে। এ এলাকার মানুষ ইলিয়াস আলী গুমের প্রতিবাদ করবে লুনা ভাবীকে জয়ী করে।’
খাজাঞ্চি এলাকার নিজাম উদ্দিন বলেন,‘ মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। দুর্নীতিমুক্ত ও চাঁদাবাজমুক্ত দলের বিজয় চায়। সেই হিসেবে জামায়াত জোটের প্রার্থী মুনতাসির একজন সৎ প্রার্থী। তিনি জয়ী হলে বিশ^নাথের উন্নয়নে কোনো দুর্নীতি ও লুটপাট হবে না।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট-৩ আসনে লালাবাজারে বিএনপি প্রার্থী এম এ মালিকের প্রচারণা জমেছে। প্রতিদিন সেখানে মিছিল হচ্ছে, লিফলেট বিতরণ হচ্ছে। মাইকে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শেষ মুহুর্তে এসে জামায়াতের জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা মার্কার প্রার্থী মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজুর প্রচারপত্র বিতরণ হচ্ছে। একমাত্র বালাগঞ্জ ছাড়া মুসলেহ উদ্দিন রাজুর প্রচারণা অন্য দুই উপজেলায় তেমন চোখে পড়ছে না। এদিকে, মালিক তিন উপজেলায় ব্যাপক-প্রচারণা চালাচ্ছেন। ওই আসনে জাপার প্রার্থী আতিকুর রহমান আতিক। তার পক্ষেও ব্যাপক প্রচরাণা চলছে।
লালাবাজারের বিএনপি নেতা দিলাল খান বলেন,‘ আমি জাগো দল থেকে বিএনপি করি। এখানে মালিক ভাইয়ের পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে। মালিক ভাই সারা দেশের মানুষের কাছে একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। তিনি নির্বাচিত হলে আমাদের উন্নয়ন খুব বেশি হবে।’
সিলেট-৪ আসনে পাল্টাপাল্টি প্রচারণায় সরগরম হয়েছে নির্বাচনি মাঠ। জামায়াতের প্রার্থী জয়নাল আবেদীন জৈন্তাপুরে সমাবেশ ডাকলে, একই সময় কোম্পানিগঞ্জে সমাবেশ করছেন বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী। আসনটিতে হাকিমকে কাছে নিয়ে নির্বাচনি মাঠ সরব করেছেন আরিফ। এদিকে, জামায়াতের জয়নাল এতদিন গোপনে প্রচার চালালেও এখন তিনি প্রকাশ্যে মিছিল করেছেন। এতে তার পক্ষে গণজোয়ার তৈরির আমেজ এনেছেন নির্বাচনের শোভাযাত্রায়।
সিলেট-৫ আসনে চাকসু মামুন বিএনপির তৃণমূলকে নিয়ে বিশাল সমাবেশ করেছেন। দলের বিদ্রোহী হলেও তাকে ছেড়ে যায়নি কর্মীরা। অন্যদিকে, বিএনপির জোটের প্রার্থী মাওলানা উবাদুল্লাহ ফারুক বেশ কিছু খন্ড-খন্ড সভা করেছেন। এদিকে, জামায়াতের জোটের প্রার্থী মাওলানা আবুল হাসান শুরুতে নীরব থাকলেও এখন তিনি প্রকাশ্যে প্রচারণায় এসেছেন। এতে মূল লড়াইয়ে তাকে নিয়েও হিসেব-নিকেশ চলছে।
সিলেট-৬ আসনের প্রচারণায় এগিয়ে আছেন বিএনপির প্রার্থী এমরান আহমেদ চৌধুরী। তিনি প্রতিদিনই বড় জমায়েত করছেন। উঠান বৈঠক থেকে শুরু করে হাট-বাজারে হেঁটে ভোট চাইছেন এমরান। তিনি তার প্রচারণায় সমাবেশে রাখছেন মনোনয়ন লড়াইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বি ফয়সল চৌধুরী ও সৈয়দ ড. মকবুল হোসেনের মেয়ে সৈয়দা আদিবাকে। যার মধ্য দিয়ে এমরান ঐক্যবদ্ধ বিএনপির ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছেন। এদিকে, অনলাইন প্লাটফর্মে জামায়াতের প্রার্থী সেলিম উদ্দিন সরব রয়েছেন। জাতীয় সংসদের দৃশ্যায়ন করে নির্বাচনী তথ্যচিত্র তিনি প্রচার করছেন। শুধু তাই-ই নয়, তিনি বিভিন্ন জনসভায় নানা চমক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.