প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১৫:১২ (সোমবার)
ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী থেকে সংসদে লুনা

দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক শূন্যতা, অনিশ্চয়তা আর আবেগঘন প্রত্যাশার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পুনরুদ্ধার হলো সিলেট-২ আসন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম. ইলিয়াস আলীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করলেন তাঁরই সহধর্মিণী তাহসিনা রুশদীর লুনা। এই জয়ের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু একটি আসন পুনরুদ্ধারই করেননিÑ ইতিহাসও গড়েছেন সিলেট জেলার প্রথম নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে। ফলে এ বিজয় কেবল ব্যক্তিগত বা দলীয় নয়Ñ এটি পরিণত হয়েছে প্রতীকী, আবেগঘন এবং রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এক ঘটনায়।


সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) আসন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। এই আসন থেকে দুই দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক এম. ইলিয়াস আলী। সাংগঠনিক দক্ষতা, তৃণমূল সংযোগ, রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।


তবে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে। সেই পরাজয় ছিল বিএনপির জন্য রাজনৈতিক ধাক্কা। কিন্তু  প্রকৃত শূন্যতা তৈরি হয় ২০১২ সালে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায়। 
এরপর দীর্ঘসময় ধরে এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে আর কোনো শক্ত প্রার্থী মাঠে নামেননি। ফলে সাংগঠনিকভাবে বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে একধরনের হতাশা, ভাঙন ও অপেক্ষা তৈরি হয়- কবে ফিরে পাবে ‘ইলিয়াস আলীর আসন’।


রাজনীতিতে সরাসরি সক্রিয় না থাকলেও স্বামীর নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে জনসমক্ষে আসতে শুরু করেন তাহসিনা রুশদীর লুনা। প্রথমদিকে মানববন্ধন, স্মরণসভা, গুমবিরোধী আন্দোলনসহ নানান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি সহানুভূতি ও সমর্থন অর্জন করেন।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু ‘নিখোঁজ নেতার স্ত্রী’ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতি গড়ে তোলেন। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গে সংযোগ এবং নারী ভোটারদের কাছে আবেগঘন আবেদনÑ সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে নিজের একটি রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল তাঁকে প্রার্থী ঘোষণা করলে তাৎক্ষণিকভাবে কর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। অনেকেই এটিকে ‘ইলিয়াস আলীর অসমাপ্ত লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা’ হিসেবে দেখেছেন।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যায়, লুনা শুধু জয়ীই হননি প্রায় ৮০ হাজার ভোটের বিরাট ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। এ ব্যবধান রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে। 


সিলেট জেলা থেকে এর আগে কোনো নারী সংসদ সদস্য সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হননি। ফলে তাহসিনা রুশদীর লুনার বিজয় নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের দিক থেকেও একটি মাইলফলক।
এ অঞ্চলে নারীর ভোটার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলেও নেতৃত্বের জায়গায় তাদের উপস্থিতি কম ছিল। লুনার জয় সেই বাস্তবতায় নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ বিজয় ভবিষ্যতে সিলেটে নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।


এদিকে, বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর অঞ্চল প্রবাসী অধ্যুষিত। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর পরিবার এখানে ভোটার। ইলিয়াস আলীর সময় থেকেই প্রবাসী নেটওয়ার্ক ছিল শক্তিশালী। লুনা সেই নেটওয়ার্ক পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হন। অনলাইন প্রচারণা, দেশে এসে সরাসরি প্রচার এবং পরিবারভিত্তিক ভোট মবিলাইজেশন- সব মিলিয়ে প্রবাসী ফ্যাক্টর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। 
আওয়ামী লীগ-বিএনপি সমীকরণের পরিবর্তন:

সিলেট-২ আসনে এ ফলাফল স্থানীয় রাজনীতির শক্তির ভারসাম্যেও পরিবর্তন এনেছে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক উপস্থিতি থাকলেও এ নির্বাচনে তারা প্রত্যাশিত ফল পায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারবিরোধী ভোটের একীকরণ, স্থানীয় ইস্যু এবং প্রার্থীভিত্তিক আবেগ- এসব কারণে ক্ষমতাসীন দলের ভোটব্যাংকে ভাঙন দেখা যায়।


লুনার বিজয় মিছিলে একটি স্লোগান বেশি শোনা গেছে- ‘ইলিয়াস আলীর অসমাপ্ত লড়াই চলবে।’ এটি প্রমাণ করে, তাঁর বিজয়কে সমর্থকরা শুধু রাজনৈতিক নয়Ñ ন্যায়বিচার ও স্মৃতির লড়াই হিসেবেও দেখছেন। ফলে সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর ওপর প্রত্যাশাও অনেক ব্যতিক্রমধর্মী পাহাড়সম।
জাতীয় রাজনীতিতে প্রতীকী তাৎপর্য:


তাহসিনা রুশদীর লুনার বিজয় জাতীয় পর্যায়েও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, গুম ইস্যু আবার রাজনৈতিক বিতর্কে সামনে এসেছে। পরিবারভিত্তিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। নারী নেতৃত্বের প্রসঙ্গ জোরালো হয়েছে। ফলে তাঁর সংসদে উপস্থিতি প্রতীকী রাজনীতিতেও গুরুত্ব বহন করবে।
বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে এ জয় শুধু আসন নয়Ñ এক ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন। সব মিলিয়ে সিলেট-২ আসনের এ নির্বাচন ছিল স্মৃতি, শূণ্যতা, আবেগ ও উত্তরাধিকারের সম্মিলিত রাজনৈতিক অধ্যায়।


১৭ বছর পর ধানের শীষের প্রত্যাবর্তন, নিখোঁজ নেতার পরিবারের পুনরুত্থান এবং জেলার প্রথম নারী এমপি নির্বাচিত হওয়াÑ এই তিন বাস্তবতা মিলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সিলেট-২ এ এক ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করেছে।


এখন দেখার বিষয়, আবেগঘন এ বিজয়কে কতটা কার্যকর রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ দিতে পারেন তাহসিনা রুশদীর লুনা। তাঁর সামনে যেমন প্রত্যাশার পাহাড়, তেমনি সুযোগও বিশালÑ স্বামীর অসমাপ্ত রাজনৈতিক অধ্যায়কে নতুন পরিণতিতে পৌঁছে দেওয়ার।


নির্বাচিত হওয়ার পর তাহসিনা রুশদীর লুনা এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই বিজয় কেবল একটি নির্বাচনী ফলাফল নয়Ñ এটি দীর্ঘদিনের ত্যাগ, ভালোবাসা, আস্থা ও প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। আমি এই বিজয়কে ব্যক্তিগত কোনো অর্জন মনে করি না। এটি আমার এলাকার মানুষদের বিজয়, গণমানুষের বিজয়। আর সবচেয়ে বড় কথাÑ এটি আমার স্বামী এম ইলিয়াস আলীর বিজয়। 


এসময় তিনি এম. ইলিয়াস আলী ও সিলেট-২ আসনের জনগণের প্রতি বিজয় উৎসর্গ করে বলেন, এম. ইলিয়াস আলীর স্মৃতি, তাঁর আদর্শ, মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাÑ সবকিছুই তাঁকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করেছে। নির্বাচনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তে আমি মানুষের মাঝে ইলিয়াস আলীর উপস্থিতি অনুভব করেছি। মানুষ তাঁকে ভুলে যায়নি, তাঁর প্রতি ভালোবাসা এতটুকুও কমেনি- এই রায় তারই প্রমাণ। তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ইলিয়াস আলী আমাদের মাঝে ফিরবেন।


ইলিয়াসপত্নী বলেন, এই বিজয়ের পেছনে দলীয় নেতাকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ ও নিরলস প্রচেষ্টা রয়েছে। অনেক বাধা, প্রতিকূলতা ও শঙ্কা থাকা সত্ত্বেও নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছেন। তাঁদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞত্
াএকই সঙ্গে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকাও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। 


তিনি বলেন, দেশের বাইরে থেকেও আপনারা হৃদয়ে ধারণ করেছেন প্রিয় জন্মভূমিকে। আপনাদের এই ভালোবাসা ও সমর্থন আমাদের পথচলাকে আরও শক্তিশালী করেছে।


নবনির্বাচিত এই জনপ্রতিনিধি তাঁর অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, আমি সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করতে চাই। বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগরের প্রতিটি সমস্যা চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে সমাধান করা হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান—প্রতিটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আমি বদ্ধপরিকর।
তিনি বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা তার রুহের মাগফেরাত কামনা করে বলেন, ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর আমাকে এই এলাকার দায়িত্ব দিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তারই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমার পথচলা শুরু।


তিনি আরও বলেন, রাজনীতি তাঁর কাছে ক্ষমতার নয়, সেবার। মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা, বঞ্চিতদের পাশে দাঁড়ানো এবং এলাকার সার্বিক উন্নয়নই হবে মূল লক্ষ্য। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি- আপনাদের আস্থা ও ভালোবাসার মর্যাদা রাখবো ইনশাআল্লাহ।
শেষে তিনি সকল ভোটার, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী ও সাধারণ মানুষের প্রতি দোয়া কামনা করেন এবং ঐক্যবদ্ধভাবে এলাকার উন্নয়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। 
তাঁর ভাষায়, এই বিজয় আমাদের সবার। আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রিয় এলাকার উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির নতুন অধ্যায় রচনা করি।