প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১৫:১৬ (সোমবার)
সিলেটে নতুন নেতৃত্বেই আস্থা 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগে বড় ধরনের পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছেন ভোটাররা। বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে ১৬টিতেই জয়ী হয়েছেন নতুন মুখÑ যা সাম্প্রতিক সময়ের নির্বাচনী ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিজয়ী প্রার্থীদের মধ্যে মাত্র তিনজন আগে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাকিরা প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন। ফলে সিলেট বিভাগে নেতৃত্বে প্রজন্মগত ও কৌশলগত পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।


সাবেক এমপিদের মধ্যে রয়েছেন, সুনামগঞ্জ-২ আসনের নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সুনামগঞ্জ-৫ আসনের কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন এবং মৌলভীবাজার-৩ আসনের এম নাসের রহমান। এর মধ্যে কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন তিনবার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, আর নাছির উদ্দিন চৌধুরী ও এম নাসের রহমান একবার করে এমপি ছিলেন। অভিজ্ঞতার দিক থেকে তারা এগিয়ে থাকলেও এবারের নির্বাচনে নতুন প্রার্থীদের ঢেউই ছিল সবচেয়ে প্রবল।


নবনির্বাচিতদের তালিকায় সিলেট জেলার ছয়টি আসনেই এসেছে নতুন নেতৃত্ব। সিলেট-১ আসনে জয়ী হয়েছেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদীর লুনা, সিলেট-৩ আসনে এম এ মালিক, সিলেট-৪ আসনে আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট-৫ আসনে মুফতি মাওলানা আবুল হাসান এবং সিলেট-৬ আসনে এমরান আহমদ চৌধুরী। এই ছয় আসনেই নতুন নেতৃত্বের উত্থান স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


মৌলভীবাজার জেলাতেও পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। মৌলভীবাজার-১ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন নাসির উদ্দিন আহমদ, মৌলভীবাজার-২ আসনে শওকতুল ইসলাম এবং মৌলভীবাজার-৪ আসনে মজিবুর রহমান চৌধুরী। নতুনদের এই জয় স্থানীয় উন্নয়ন, অবকাঠামো ও প্রবাসী অধ্যুষিত অর্থনীতিতে নতুন গতি আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।


সুনামগঞ্জ জেলার নতুন বিজয়ীদের মধ্যে রয়েছেন সুনামগঞ্জ-১ আসনে কামরুজ্জামান কামরুল, সুনামগঞ্জ-৩ আসনে কয়ছর এম. আহমদ এবং সুনামগঞ্জ-৪ আসনে নুরুল ইসলাম। হাওরাঞ্চলের উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসবে।
হবিগঞ্জ জেলাতেও চারটি আসনেই এসেছে নতুন নেতৃত্ব। হবিগঞ্জ-১ আসনে ড. রেজা কিবরিয়া, হবিগঞ্জ-২ আসনে ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান, হবিগঞ্জ-৩ আসনে জি. কে. গউস এবং হবিগঞ্জ-৪ আসনে সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সল নির্বাচিত হয়েছেন।
নতুন নির্বাচিতদের মধ্যে দুইজন সাবেক মেয়র থাকায় স্থানীয় সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা জাতীয় সংসদে কাজে লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে।


সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও দুইবার মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। অন্যদিকে জি কে গউস তিনবার হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ছিলেন এবং একবার কারাগারে থেকেও মেয়র নির্বাচিত হয়ে ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক রেকর্ড গড়েছিলেন- যা তার জনপ্রিয়তারই প্রতিফলন।


এদিকে নির্বাচন পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, এই বিজয় কেবল প্রার্থীদের নয়- এটি জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিজয়।  তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসা বেগম খালেদা জিয়ার ত্যাগ ও নেতৃত্বের ফলেই জনগণ এবার তাদের রায় স্পষ্টভাবে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশের মানুষের হৃদয়ে ইতোমধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন তারেক রহমান। ভবিষ্যতে জাতীয় নেতৃত্বে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।


সিলেট-১ 
বাম দলের তিন প্রার্থী কে কত ভোট পেলেন
সিলেট-১ আসনে (সিটি করপোরেশন-সদর উপজেলা) নির্বাচনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিছিলেন ৮ জন প্রার্থী। এদের মধ্যে তিনটি বামপন্থী দল থেকে তিনজন প্রার্থী হয়েছিলেন। তারা হলেন- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) আনোয়ার হোসেন সুমন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রণবজ্যোতি পাল ও বাসদ (মার্কসবাদী)-এর সঞ্জয় কান্তি দাস।
বামদলের তিন প্রার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রণবজ্যোতি পাল। মই প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ১ হাজার ১৩৪ ভোট। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) আনোয়ার হোসেন সুমন কাস্তে প্রতীকে পেয়েছেন ৯০৮ ভোট। আর বাসদ (মার্কসবাদী)-এর সঞ্জয় কান্তি দাস কাঁচি প্রতীকে পেয়েছেন ৮০১ ভোট।
গত বছরের শেষের দিকে ‘গণতন্ত্র কায়েম, ভোটাধিকার নিশ্চিত ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার’ লক্ষ্যে নিয়ে সব বামদলগুলো মিলে গঠিত হয় ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’। দেশের বিভিন্ন স্থানে এই যুক্তফ্রন্ট থেকে একক প্রার্থী দেওয়া হলেও ব্যতিক্রম সিলেটে। সিলেট-১ আসনে বামদলগুলো থেকে তিনজন প্রার্থী হন।

সিলেটে বিদ্রোহীদের ভরাডুবি, হেরেছেন ৫ জনই
স্টাফ রিপোর্ট
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগের বিএনপি ভূমিধস জয় পেয়েছে। আর ভরাডুবি ঘটেছে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া দলটির বিদ্রোহীদের।
সিলেট বিভাগের ৫টি আসনে আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন বিএনপির বিদ্রোহীরা। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দল থেকেও বহিস্কার করা হয় তাদের। তবু পিছু হঠেননি এই প্রার্থীরা। কিন্তু ভোটের লড়াইয়ে হেরে যেতে হলো তাদের। 


সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনে বিএনপির পক্ষ থেকে আসনটি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে ছেড়ে দেওয়া হয়। জোটের প্রার্থী হন দলটির নেতা উবায়দুল্লাহ ফারুক। এই সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মামুনুর রশীদ ওরফে চাকসু মামুন। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে বহিস্কার করা হয় তাকে।
বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে এই একটি মাত্র আসনেই পরাজিত হতে হয় বিএনপি জোটকে। এ আসনে ১১ দলের জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান বিজয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের উবায়দুল্লাহ ফারুক পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনর ররশীদ পেয়েছেন ৫৭ হাজার ২৫১ ভোট।
সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ) আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন। এ আসনে ৯৭ হাজার ৩১৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ। আর বিদ্রোহী আনোয়ার পেয়েছেন ৪২ হাজার ২২৬ ভোট। এখানে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ শাহীনুর পাশা চৌধুরী পেয়েছেন ১৪ হাজার ২০৩ ভোট।

সুনামগঞ্জ-৪ (সদর উপজেলা ও বিশম্ভরপুর) আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হন জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন। প্রচারের সময় আলোচনায় থাকলেও ভোটের মাঠে তেমন সুবিধা করতে পারেননি তিনি।
এ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নুরুল ইসলাম নুরুল ৯৮ হাজার ৯২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি জামায়াতের সামছউদ্দিন আহমদ পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৭৩৫ ভোট। আর দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন পেয়েছেন ২৬ হাজার ৩০৭ ভোট।

মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনে বিএনপি নেতা ও শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান মো. মহসিন মিয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু ভোটের লড়াইয়ে তিনি তৃতীয় হয়েছেন। এ আসনে ১ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির দলীয় প্রার্থী মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত শেখ নূরে আলম হামিদী রিকশা প্রতীকে পেয়েছেন ৫০ হাজার ২০৪ ভোট। আর মহসিন মিয়া পেয়েছেন ৩৪ হাজার ১৪৭ ভোট।

হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়া। তবে ভোটের মাঠে সুবিধা করতে পারনেনি তিনি।
এ আসনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়া। তার প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ১১ হাজার ৯৯৯। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের মাওলানা সিরাজুল ইসলাম রিকশা প্রতীকে পেয়েছেন ৫৬ হাজার ১৩২ ভোট। আর শেখ সুজাত পেয়েছেন মাত্র ২৪ হাজার ৬৩৭ ভোট।