প্রকাশিত: ২৮ মার্চ, ২০২৬ ০৬:২১ (মঙ্গলবার)
ইউনূস রাজি না হওয়ায় বেছে নেওয়া হয় ফখরুদ্দীনকে

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারির পর অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যাত্রা শুরু করেছিল। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সেই সরকার বিদায় নেয়। ড. ফখরুদ্দীন আহমেদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার আগে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা গিয়েছিলেন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে। এই সেনা টিমের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।

২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেন সরকারের অন্যতম কুশীলব সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য জানিয়েছেন। পল্টন থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশসহ একাধিক সংস্থার সদস্যরা।

জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করতে তিনি এবং ব্রিগেডিয়ার ফজলুল বারী চৌধুরী তার সঙ্গে দেখা করেন। তখন ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাদের কাছে জানতে চান- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ কতদিন হবে এবং উপদেষ্টা পরিষদে কারা কারা থাকছেন। তখন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর পক্ষ থেকে উপদেষ্টা পরিষদের সম্ভাব্য সদস্যদের একটি তালিকা দেখানো হয়। কিন্তু সরকারের মেয়াদ দুই বছর হবে শোনার পর তিনি প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তখন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি টিম ফখরুদ্দীন আহমেদের সঙ্গে দেখা করে তাকে প্রধান উপদেষ্টা করার প্রস্তাব দেন। এতে তিনি রাজি হয়ে যান। 

এরপর ফখরুদ্দীন আহমেদের সঙ্গে আলোচনা করে উপদেষ্টা পরিষদ ঠিক করে দেয় সেনাবাহিনী। এ প্রক্রিয়ায় পর্দার আড়াল থেকে সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ তদারকি করেন। এরপরই ২০০৭ সালের ১২ জানুয়ারি বঙ্গভবনে শপথের মাধ্যমে ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যাত্রা শুরু হয়। তবে ওই শপথ অনুষ্ঠানে চার-দলীয় জোট সরকারের কেউ উপস্থিত ছিলেন না। এর আগেই ফখরুদ্দীন আহমেদকে প্রধান উপদেষ্টা করার বিষয়টি দুই নেত্রীকে জানানো হয়েছিল বলে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।

জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী আরও বলেছেন, ফখরুদ্দীন আহমেদ সরকারের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেনাবাহিনীর সঙ্গে পরামর্শ করতে হতো। অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয় সেনাবাহিনী তৈরি করে দিত। দুই নেত্রীসহ রাজনৈতিক দলের নেতা, ব্যবসায়ীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে সেনাবাহিনীই সিদ্ধান্ত নেয়। তবে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের আগে বিষয়টি দুটি প্রভাবশালী দেশকে জানানো হয়েছিল। গ্রেপ্তারের পর তাদের সংসদ ভবন এলাকায় বিশেষ কারাগারে রাখার যে সিদ্ধান্ত সেটিও সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্তে হয়েছিল।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জিজ্ঞাসাবাদে আরও বলেছেন, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তাদের সঙ্গে নির্বাচন, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎসহ নানা ইস্যুতে দরকষাকষি সেনাবাহিনীই করত। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ডিজিএফআই এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করত। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলুল বারী চৌধুরী এবং মেজর জেনারেল এটিএম আমিন বেশিরভাগ সময় কারাগারে গিয়ে দুই নেত্রীর সঙ্গে বৈঠক করতেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে পর্দার আড়ালে দরকষাকষি করতে শেখ হাসিনা প্রায়শই সংসদ ভবন এলাকার বিশেষ কারাগার থেকে সন্ধ্যার পর বের হয়ে যেতেন। এরপর বিভিন্ন জনের সঙ্গে বৈঠক করে আবার কারাগারে ফিরতেন। পর্দার আড়ালে এসব বৈঠক আয়োজনের সব কিছু ডিজিএফআই দেখভাল করত বলে জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার, ব্যবসায়ীদের হয়রানি করে অর্থ আদায়, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক নির্যাতনসহ আরও নানা গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে গোয়েন্দা পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া নিজেকে জড়িয়ে বক্তব্য দিতেও সতর্কতা অবলম্বন করছেন বলে গোয়েন্দা পুলিশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য এবং বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার যাত্রা শুরু করে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল টালমাটাল। আর বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট ছিল ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি। চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসবে কেএম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শপথ নেওয়ার কথা ছিল। কেএম হাসান ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টা হতে প্রস্তুত ছিলেন। পূর্ব প্রস্তুতি হিসাবে প্রধান উপদেষ্টার শপথগ্রহণের সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিল বঙ্গভবন। তার পিএস, ব্যক্তিগত স্টাফও চূড়ান্ত করা হয়েছিল। এ ছাড়া বিষয়টি কয়েকটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রকে বঙ্গভবন থেকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে বিচারপতি কেএম হাসান প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। বিচারপতি কেএম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা করানোর ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের আপত্তি ছিল। এ ইস্যুটি শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছিলেন। এমন প্রেক্ষাপটে সেনা গোয়েন্দারা কেএম হাসানের সঙ্গে দেখা করে প্রধান উপদেষ্টা না হতে পরামর্শ দেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে ইয়াজউদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকার যে আন্দোলন করছিল, এর পেছনে সেনা গোয়েন্দারা দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দিচ্ছিলেন। তারা পুরো ঘটনাপ্রবাহের ওপর নজর রাখছিল নিবিড়ভাবে। আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার আন্দোলন জোরালো করতে সেনা গোয়েন্দাদের হাত ছিল। আন্দোলনকালে ডিজিএফআইয়ের এক কর্মকর্তা প্রতিদিন ছদ্মবেশে শাহবাগ পুলিশ কন্ট্রোলরুমে বসে পুরো ঢাকার পরিস্থিতি ‘রিয়াল টাইম’ নজরদারি করছিলেন। কিন্তু একটা পর্যায়ে ওই কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার শহীদুল ইসলামের হাতে ধরা পড়ে যান। এরপর ওই কর্মকর্তাকে শাহবাগ পুলিশ কন্ট্রোলরুম থেকে বের করে দেওয়া হয়। সেনা গোয়েন্দাদের পরামর্শেই তৎকালীন ঢাকার পুলিশ কমিশনার বজলুর রহমান গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলতেন না। এসব বিষয়েও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।