# নেপথ্যে কিশোরগ্যাং, ব্যক্তিগত বিরোধ
# ভিডিও করে ভয় দেখানো
# ঘটনা ধামাচাপা দিচ্ছে পুলিশ
ব্যক্তিগত তুচ্ছ ঘটনার জেরে সিলেট নগরীতে একের পর এক অপহরণ ও মুক্তিপণের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার জড়িত হয়ে পড়েছে কিশোরগ্যাংয়ের সদস্যরা। এসব ঘটনায় চাওয়া হয়েছে ৫ হাজার টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকার মুক্তিপণ। কোনো কোনো ঘটনায় ভিকটিমের মোবাইল-মালামাল ও নগদ টাকা লুট করার পর আরও টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে। আবার মুক্তিপণ নিতে এসে অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা আটকও হয়েছে।
সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনার মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে এসএমপির কয়েকটি থানার চালচিত্র।
কেইস স্টাডি-(১):
নগরীর পূর্ব কাজিরবাজারের লাকি বিস্কুট ফ্যাক্টরির মালিক আজহার মিয়ার ভাতিজা ভিকটিম রিফাতকে (১৬) গতকাল সোমবার ভোরের কোনো এক সময় ফ্যাক্টরি থেকে অপহরণ করা হয়। তারপর সকালে একটি অচেনা নম্বর থেকে রিফাতের মা ফাতেমা বেগমের কাছে বিকাশে মাত্র ৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ চায় চক্রটি।
অপহরণকারীরা দাবি করে, ওই টাকা পেলে রিফাতকে মুক্তি দিবে। এদিকে, রাতেই আজহার তার ভাতিজা রিফাতের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জেনে তাকে খুঁজতে থাকেন। রিফাতের ভাবি ফাতেমা বিকাশে মুক্তিপণ চাওয়ার বিষয়টি অবহিত হলে তিনি কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের কাছে গিয়ে একটি লিখিত অভিযোগ করেন। পরে পুলিশের কথামতো বিকাশ নম্বরওয়ালা চক্রটির সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি এজেন্ট নম্বর চেয়ে বিকাশে টাকা দিতে রাজি হন। চক্রটি আজহারকে একটি এজেন্ট নম্বর দেয়, যা ছিল জৈন্তাপুর থানা এলাকার।
পরে কোতোয়ালি পুলিশের টিম ভিকটিমের স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে সেখানে ফাঁদ পেতে চক্রের সদস্য রফিকুল ইসলামকে আটক করে। তার দেয়া তথ্যমতে পুলিশ রিফাতকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। উদ্ধারকৃত ভিকটিম রিফাত লালদিঘিরপার ১৪ নম্বর বাসার রিপন মিয়া ও ফাতেমা বেগমের ছেলে। তাদের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর গ্রামে।
কেইস স্টাডি (২) :
৮ মার্চ, রাত ১টার দিকে নগরীর তাঁতিপাড়ার ৫৬ নম্বর নাজমা নিবাসে একটি মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা ঘটে। ওই বাসা থেকে পুলিশ ১০ জন অপহরণকারী চক্রের সদস্যদের আটক করেÑ যাদের বেশিরভাগই কিশোরগ্যাংয়ের সদস্য। তারা ওই রাতে সুহেল সরকার (২২) নামের এক যুবককে নগরীর তাঁতিপাড়া মোড় থেকে অপহরণ করে নাজমা নিবাসের ওই বাসায় জিম্মি করে। এসময় পথচারীরা খবরটি পুলিশকে জানায়।
তাৎক্ষণিক কোতোয়ালি পুলিশের একাধিক টিম ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে ভিকটিমকে উদ্ধার করে এবং ওই চক্রের ১০ কিশোরকে আটক করে। আটককৃতরা হলেনÑ তানজিম মাহবুব নিশান (২১), আহসান হাবিব মুন্না (১৯), জুবাইন আহমদ (১৯), সুফিয়ান আহমদ (১৯), মো. জাকির হোসেন (১৯), মো. মারজান (১৯), মোসাদ্দেক আলী (১৮), ফারদিন আহমদ (১৮), জয়নাল আবেদীন রাব্বি (১৮) ও মিজান আহমদ (১৮)। এজাহারে বলা হয়, নাজমা নিবাসে সুহেল সরকারকে ধারালো চাকু ও কেচি দিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং লোহার রড ও স্টিক দিয়ে মারধর করা হয়।
একপর্যায়ে ভিকটিমের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয় এবং তার ব্যবহৃত একটি ফোন ছিনিয়ে নেয়া হয়। এছাড়া তাকে কাপড় খুলে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয়। এ ঘটনায় সিলেট কোতোয়ালি থানায় অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে।
কেইস স্টাডি (৩) :
গত ১১ মার্চ দৈনিক সিলেটের মানচিত্র অফিসের অফিস সহকারী সোয়েব আহমদ (২৪) অপহরণের শিকার হন। অপহরণকারীরা তাকে তুলে নিয়ে নিকটবর্তী চা বাগানে নিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে মারধর করে, নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এসময় তার সঙ্গে থাকা পত্রিকা আইডি, মোবাইলফোন, গলার চেইন ও একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি লুট করা হয়। পরে তাকে উলঙ্গ করে ভিডিও করে ফেসবুকে ছেড়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। দাবিকৃত মুক্তিপণ দেওয়ার শর্তে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
বুধবার দুপুর ২ টায় প্রথমে আম্বরখানা এবং পরবর্তী ঘটনা ওই দিন লাক্কাতুরা চা বাগানের টিলায় বিকাল ৫টা পর্যন্ত এ চাঞ্চল্যকর অপহরণের ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় ভিকটিম সোয়েব আহমদের পিতা স্থানীয় দক্ষিণ লালবাগের বাসিন্দা বাদি হয়ে এয়ারপোর্ট থানার একটি লিখিত এজাহার দাখিল করেন। কিন্তু আসামিদের সঙ্গে পুলিশের গোপন সখ্যতা থাকায় মামলা নিচ্ছে না এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ। উল্টো মামলাটি ব্যক্তিগত বিরোধের অজুহাত দেখিয়ে ধামাচাপার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভিকটিম সুয়েব এ ঘটনায় থানায় দাখিল করা এজাহারের সুরাহা না পেলে আদালতের দ্বারস্থ হবেন বলে জানান। এসএমপি পুলিশের উচ্চমহল বলছে, সুয়েবের ঘটনার বিষয়ে এয়ারপোর্ট থানাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম বলেন, ‘মূলত, কিশোর অপরাধীদের কারণে অপহরণ ও মুক্তিপণের ঘটনা ঘটছে। এসএমপির কিশোরগ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযান করবে পুলিশ। ইতিমধ্যে, কিছু ঘটনায় জড়িতদের আটক করে কোতোয়ালি পুলিশ। এয়ারপোর্ট থানার ভিকটিম সুয়েবের ঘটনা সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.