প্রকাশিত: ০১ এপ্রিল, ২০২৬ ১৪:৫৩ (মঙ্গলবার)
চাঁদাবাজদের কবলে ৩৫০ হকার

সিলেট নগরীর ফুটপাত যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে প্রতিদিনই লড়াই চলে জীবিকার সঙ্গে ক্ষমতার, হকারদের সঙ্গে চাঁদাবাজদের। ঈদের পর থেকে নগরীর ফুটপাতগুলো অনেকটা ফাঁকা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণকারী চাঁদাবাজরা আত্মগোপনে থাকলেও তাদের কবলে এখনও অন্তত ৩৫০ হকার রয়ে গেছেন। সিলেটে চাদাবাজদের দুটি গ্রুপ রয়েছে। এক গ্রুপ থাকতে চায় ফুটপাতে। আরেক গ্রুপ চায় মাঠে থাকতে। এনিয়ে তাদের মধ্যে এখনো কোনো ঐক্যমতে পৌছেনি। শেল্টারদাতা দৌড়ের ওপর থাকায় বৈঠক ফলপ্রসু হচ্ছে না বলে জানা গেছে। 

জানা গেছে, উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে সিলেট নগরীর ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখতে পুলিশ র্শীর্ষ চাঁদাবাজদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।  ইতিমধ্যে তিনজন চাঁদাবাজকে আটক করা হয়েছে। তাই নগরীর ফুটপাতগুলো ঈদের পরে অনেকটা ফাঁকা রয়েছে। রাজনৈতিক শেল্টার না পেলে এই হকারদের একত্রিত করে দুটি দাবি নিয়ে আন্দোলনের পরিকল্পনা করছে দুটি গ্রুপ। কিছু হকার নেতা ফুটপাতে আর ব্যবসা করতে চান না। লালদিঘি মাঠের যথাযথ সংস্কার দাবি করেন তারা। অন্যদিকে লালদিঘী শেডে নয় কিছু হকার থাকতে চান ফুটপাতেই। এমন অন্তত ৩৫০ হকার চাঁদাবাজদের কবলেই রয়ে গেছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

পুলিশ ও হকার সূত্র জানায়, ঈদের পর থেকেই এসএমপি পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে চাঁদাবাজদের একটি তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ। ঈদের আগে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে পুলিশ কমিশনারকে ফুটপাতের চাঁদাবাজদের ধরতে নির্দেশ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের মাধ্যমে সিলেট নগরীর ফুটপাত নিয়ন্ত্রণকারী চাঁদাবাজদের নামের তালিকা তৈরি করে পুলিশ। ঈদের আগে ও পরে সে তালিকা অনুযায়ী পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে ব্লকরেইড অভিযান শুরু করা হয়। প্রথমেই জিন্দাবাজারের শীর্ষ চাঁদাবাজ ল্যাংড়া কামালকে আটক করা হয়। পরে লালদিঘিপাড়ের চাঁদাবাজ ইউসুফ আলী ও আব্দুস সাত্তারকে আটক করে পুলিশ।

কামালকে ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর হামলার মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ইউসুফ আলীর বিরুদ্ধে সিলেট কোতোয়ালি থানায় একটি নতুন চাঁদাবাজি মামলা করা হয়েছে। এ দুজনকে আটকের পর থেকেই নগরীর ফুটপাত নিয়ন্ত্রণকারী বাকি চাঁদাবাজরা আত্মগোপনে চ গেলেও তারা বসে নেই।

হকার সূত্র আরও জানায়, নগরীর চৌহাট্টার পোশাকের ভ্যানগাড়ির প্রায় এক শ হকার নিয়ন্ত্রণ করেন মিজান। তিনি এক যুবদল নেতার নাম ভাঙিয়ে চৌহাট্টার ফুটপাতের হকারদের নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে জানা গেছে। জিন্দাবাজার থেকে চৌহাট্টা পর্যন্ত সড়কের দায়িত্বে থাকা ফাঁড়ি পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, সিসিকের কর্মী ও জেলা প্রশাসনের অন ডিউটির কর্মীদের দলীয় পরিচয়ে মিজান ম্যানেজ করে ফুটপাতে হকারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে বলে হকাররা জানান।

মিজান কাজী ইলিয়াসের বিপরীতে এক বিএনপি নেতার টাওয়ারের সিঁড়িতে অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করে ফুলের দোকান বসিয়ে এ চাঁদাবাজি করে থাকে। চৌহাট্টায় প্রতি পাঁচটি ভ্যানগাড়ির টাকা তোলার দায়িত্ব একজন হকারকে দিয়েছে মিজান। তাদের কাছ থেকে ওই ফুলের দোকানে ফুটপাতের চাঁদার টাকা চলে যায়।

হকারদের তথ্যমতে, লালদিঘি মাঠে হকারদের পুনর্বাসন করলেও  মিজান কাজি ইলিয়াসের ওই যুবদল নেতার শেল্টারে আজ পর্যন্ত মাঠের ভিতরে যায়নি। তার ছত্রছায়ায় শতাধিক কাপড় ব্যবসায়ীকে রাখা হয়েছে ফুটপাতে ব্যবসা করার জন্য। তারা প্রতিদিন চৌহাট্টার সড়ক দখল করে। মিজান হকারদের ভুয়া বৈষম্য সংগঠনের নেতা নজুকেও চাঁদার অংশ দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়ো গেছে। যে কারণে, চৌহাট্টা থেকে মিজানের হকারদের এখনও উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। উল্টো নজু ও মিজান মিলে এই হকারদের নিয়ে নানা আন্দোলনের ষড়যন্ত্র করছেন। অযৌক্তিক দাবি নিয়ে এ দুজন যেকোনো সময় সড়ক অবরোধ করতে পারেন বলে হকার সূত্র নিশ্চিত করেছে।

 

হকার সূত্রে জানা গেছে, সিলেট নগরীর প্রায় সাড়ে তিন শ হকার এখনও চাঁদাবাজদের কবলে রয়ে গেছেন। যেমন : অতীতে ক্বিনব্রিজ দখলকারী প্রায় ১ শ হকার এখনও লালদিঘি মাঠে যাননি, তারা চাঁদাবাজদের ছত্রছায়ায় আবারও ক্বিনব্রিজের ওপর পসরা সাজানোর অপেক্ষায় আছেন। তালতলা সড়কের ৫০ জন সবজি হকার এখনও মাঠে যাননি, তারাও বিক্ষিপ্তভাবে সড়কে ভাসমান অবস্থায় রয়েছেন। জেলা পরিষদের সামনের লাইনটি কাপড়ের হকারদের, সেখানেও বড় বড় হকার নেতাদের তিন চারটি দোকান বসতো। এ লাইনের আরও ৫০ জন হকার মাঠের ভিতরে যাননি, তারাও ফুটপাতে বসার জন্য প্রহর গুনছেন। প্রধান ডাকঘরের সবজি হকারদের লাইন নিয়ন্ত্রণ করে জাবেদ। তাকে শ্রমিকদলের এক শীর্ষ নেতা শেল্টার দিচ্ছেন।

ডাকঘরের সামনে সবজির ২২টি ভ্যানগাড়ির নিয়ন্ত্রণ করছে দুসহোদর। ডাকঘরের প্রায় ৫০ জন সবজি হকার এখনও মাঠের ভিতর-বাইরে ইঁদুর দৌড়ে লিপ্ত  রয়েছে।

বন্দরবাজার ফাঁড়ির পুলিশ পিকআপের চালক এদের তথ্যদাতা হিসেবে টাকা নিচ্ছে বলে হকাররা জানান। সিসিকের কিছু অসাধু সুপারভাইজাররা এ লাইন থেকে টাকার ভাগ পান। এদিকে, করিম উল্লাহ মার্কেটের সামনে, মজলিস হোটেলের সামনে ও লালদিঘি গলির ভিতরের সবজি, কলা ও ভ্যানগাড়ি থেকে ইউসুফ চাঁদাবাজি করতেন। তিনি অঅটক হলেও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। এই গলির ভিতরে আরও প্রায় ৪০ জন হকার মাঠের ভিতর যাননি, চাঁদাবাজরা তাদের নিয়ন্ত্রনে রেখেছে। হাসান মার্কেটের সামনে আরও প্রায় ২০ জন হকার ফল বিক্রি করছেন, তারাও শ্রমিক দলের শীর্ষ নেতার শেল্টারে আছেন। তারা বন্দরফাঁড়ি ও সিসিকের কর্মীদের ম্যানেজ করে সন্ধ্যার পর থেকে ফুলের ঝুঁড়ি নিয়ে সড়ক দখল করে। জিন্দাবাজারের পুরানলেন থেকে পয়েন্ট পর্যন্ত ল্যাংড়া কামালের অধীনে প্রায় ৪০ জন হকার ফুটপাত দখল করে আসছিল। পুলিশ কামালকে আটকের পর থেকে ওই লাইনে হকাররা বসতে পারছে না।

এদিকে মিজান আত্মগোপনে থেকেও ভিন্ন কৌশলে চৌহাট্টায় ফুটপাত দখল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। মিজান প্রায় এক শ পোশাক হকারদের মাঠে যেতে না দিয়ে তাদেরকে নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্ঠা করছে।

 

পুলিশ সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃতদের তথ্যমতে চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের ধরতে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে। পুলিশের অভিযানের খবর পেয়ে তালিকাভুক্তরা পালিয়ে গেছে। মিজানকে ধরতে ঈদের আগে ও পরে দুবার পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু মিজান এখন তার চৌহাট্টার ফুলের দোকানে বসে না। তবে তাকে কাজী ইলিয়াসের গলি ও চৌহাট্টার শহিদ মিনারে এখনও কিছু দোকান থেকে চাঁদা তুলতে দেখা যায়।

হকার সূত্রে জানা গেছে,  সিলেটের দুজন মন্ত্রী কোনোভাবেই ফুটপাতে হকার বসতে দিতে রাজি নন। তারা বর্তমান জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনারের উদ্যোগকে সমর্থন দিচ্ছেন। শুধু ঈদের কারণে মানবিক বিবেচনায় দুদিন হকার বসতে দেওয়া হয়েছিল। তবে হকার নেতারা ঈদের পরে আবারও মাঠে ফিরে যাবেন বলেই শর্ত মেনে নিয়েছিলেন। ঈদ শেষ হলে, হকার নেতারা তাদের কথামতো আবারও মাঠে ফিরে গেছেন।

কিন্তু পুরনো শীর্ষ হকার এক নেতা ৩৫০ জন হকার তার কবলে রেখে দিয়েছেন। যে কারণে হকার পুনর্বাসন করা হলেও প্রশাসনকে প্রতিদিন হকারদের উচ্ছেদে অভিযান করতে হচ্ছে। হকার নেতারাও এখন আর সড়ক দখলের পক্ষে নন, তারা মাঠের আরও সংস্কার দাবি করেন।

সিলেট মহানগর শ্রমিকদলের আহ্বায়ক আব্দুল আহাদ বলেন,‘ আমরা সড়ক দখল করার পক্ষে নই, মাঠের ভিতরে যথাযথ সংস্কার করে দিলে আমরা মাঠেই থাকতে চাই। তবে মাঠের ভিতরে আরও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে, হকারদের শেডগুলো লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে করা দরকার, মাঠে হকারদের শৃঙ্খলার জন্য একটি অফিস থাকা দরকার। মাঠে প্রবেশের রাস্তার বিষয়টি মীমাংসা হওয়া উচিত। এসব সুবিধা পেলে হকাররা আর সড়ক দখল করবে না বলে তিনি মনে করেন।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার মো. আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন,‘ হকাররা যদি মাঠে না যায়, তাহলে আমরা আরও কঠোর হবো। হকারদের ফুটপাতে বসিয়ে  যারা চাঁদাবাজি করছে, তাদের ধরতে আমরা সরাসরি ব্লকরেইড অভিযান শুরু করেছি। চৌহাট্টা, জিন্দাবাজার ও প্রধান ডাকঘর ; কোথাও হকার থাকতে পারবে না।’