দুই ইস্যুতে ক্ষুব্ধ সিলেটবাসী। যখন তখন ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। যার কিছুটা প্রকাশ ঘটেছে গোয়াইনঘাটের জাফলংয়ে।
ইস্যুগুলো হচ্ছে গ্যাস সংযোগ ও পাথর উত্তোলন। দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ থাকা এ দুটি ইস্যু নিয়ে বর্তমান অন্তবর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট দুই উপদেষ্টা শুক্র ও শনিবার যে বক্তব্য দিয়েছেন তা নিয়ে সিলেটের সচেতন মহলে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা।
প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ সিলেট। এ অঞ্চলের প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ হচ্ছে গ্যাস। আর দেশে প্রথম গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছে এই সিলেটেই, জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুরে।
স্থানীয়দের চাহিদা মেটানোর পর প্রাকৃতিক সম্পদ অন্যত্র নিয়ে যাওয়া- এটাই নিয়ম। অথচ সিলেটের গ্যাস সম্পদে সমৃদ্ধ তিন উপজেলা জৈন্তাপুর, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলাবাসীর দাবি যুগ যুগ ধরে উপেক্ষিত। এখনো এই তিন উপজেলার সর্বত্র গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়নি। গ্যাসের দাবি আছে অন্যান্য উপজেলাবাসীরও।
এদিকে আবার সিলেট মহানগরীর অধিবাসীদের জন্য আবাসিক গ্যাস সংযোগও বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। এ নিয়েও চলছে দেন-দরবার, দাবি-দাওয়া।
এ অবস্থায় শুক্রবার বর্তমানক সরকারের জ্বালানী উপদেষ্টা ফাওজুল কবির ঘোষণা দিয়েছেন, কেয়ামত পর্যন্ত আর আবাসিক গ্যাস সংযোগ দেয়া হবেনা।
তার এমন বক্তব্যে আহত হয়েছেন সিলেটের সর্বস্থরের মানুষ। তাদের বক্তব্য পরিস্কার, আমাদের সম্পদ আমাদেরই বুকের উপর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে অন্যত্র। এটা চরম একটা বৈষম্য এবং বঞ্চনা। সরকারের দায়িত্বশীল একটা পদে বসে তার এমন বক্তব্য সিলেটবাসীর সঙ্গে নির্মম তামাশার শামীল। এমন বক্তব্যকে অপমান হিসাবেই মনে করছেন সচেতন মহল।
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সিলেট চ্যাপ্টারের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সিলেটবাসী উপদেষ্টার এমন বক্তব্যে হতাশ। আমরা অপমানিত বোধ করছি। গ্যাস পাওয়া আমাদের ন্যায্য অধিকার। স্থানীয়দের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রাকৃতিক সম্পদ পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত। অথচ সিলেটবাসী বঞ্চিত। উপদেষ্টার এমন বক্তব্য দুঃখজনক।
সিলেটবাসীর ক্ষোভের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে পাথর উত্তোলন। দেশের বিভিন্ন স্থানের অধিকাংশ পাথর কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলেও সিলেটের ৭টি কোয়ারির মাত্র দুটি থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। অন্য ৫টি থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে প্রাকৃতিকভাবে পাথর উত্তোলনের দাবি উঠছে দীর্ঘদিন ধরে। এ নিয়ে আন্দোলন সংগ্রামও হয়েছে।
বিশেষ করে পাথর শ্রমিক হিসাবে পরিচিত নিম্ন আয়ের মানুষ এখন কর্মহীন দিশেহারা। এর প্রভাবে অনেক পরিবহন মালিক শ্রমিকের জীবনও এখন প্রায় অচল।
এদিকে দেশে পাথরের চাহিদা মেটাতে আমদানি করা হচ্ছে ভারত থেকে। সিলেটের কোয়ারিগুলো থেকে পাথর উত্তোলন শুরু হলে যেমন বেকারত্ব দূর হতো তেমনি বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হতো।
এমন দাবি যখন জোরেসুরে উচ্চারিত হচ্ছে তখন শনিবার সিলেটে এসে গোয়াইনঘাটে দাঁড়িয়ে পরিবেশ বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ঘোষণা দিলেন, সিলেটের আর কোনো কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হবেনা।
তার এমন ঘোষণায় ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। লোকজন জড়ো হয়ে জ্বালানি উপদেষ্টা ও পরিবেশ উপদেষ্টার গাড়ির বহর আটকে দেন। অবরুদ্ধ অবস্থায় তাদের থাকতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। আর এই বিক্ষোভের মুখে পড়ার ভয়ে কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর পরিদর্শনে তাদের যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা তা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। পরে সিলেটের সার্কিট হাউজে অনুষ্টিত এক সভায় পাথর উত্তোলনের ক্যাপারে তারা আরও কঠোর হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
সিলেটের কোয়ারিগুলো থেকে পাথর উত্তোলনে সাধারণ মানুষের দাবি থাকলেও বিপক্ষে কঠোর অবস্থানে আছেন পরিবেশবিদরা। তারা প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পাথর উত্তোলনের বিপক্ষে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি অনেক কাজির গরু কাগজে থাকার মতোই একটা ব্যাপার। প্রতিদিন প্রতিটি কোয়ারিতে লুটপাট চলছে। পাথর চুরি করে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এটা হচ্ছে। এ ব্যাপারে তেমন কোনো কার্য্যকর উদ্যোগ নেই।
তিনি দাবি জানান, অবিলম্বে এব্যাপারে সিলেটের প্রশাসন যেনো আরও কঠোর ভূমিকা পালন করে।
এদিকে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন বলেন, অন্যান্য কোয়ারি থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলেও সিলেটের কোয়ারিগুলোর ক্ষেত্রে তা এখনো বহাল। বরং পরিবেশ উপদেষ্টার বক্তব্য আরও কঠোর। তার বক্তব্যে হাজার হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা হতাশ। হতাশ আমরাও। এটা অবশ্যই একটা বৈষম্যমূলক আচরণ।
সিলেটবাসীর সঙ্গে বৈষম্য। একটা সিন্ডিকেটের অপতৎপরতায় প্রভাবিত হয়ে তিনি এমন ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা অবিলম্বে উপদেষ্টার এ ঘোষণাসহ প্রাকৃতিকভাবে পাথর উত্তোলনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাই।
গোয়াইনঘাটের রুস্তুমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহাব উদ্দিন বলেন, প্রাকৃতিকভাবে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দিলে শ্রমিকদের দুর্দশা কমবে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.