প্রকাশিত: ১২ এপ্রিল, ২০২৬ ১৯:২৭ (মঙ্গলবার)
কৃষকের মরণপণ চেষ্টায় রক্ষা পেল হাওরের ধান

হাজারো কৃষকের মরণপণ প্রচেষ্টায় অবশেষে রক্ষা পেয়েছে সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের প্রায় ৯ হাজার হেক্টর বোরো ধান।বিশাল এই হাওরের ‘গুজাউনি বেরিবাঁধ’ শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরের দিকে হঠাৎ ভেঙে প্রবল বেগে হু-হু শব্দে পানি ঢুকতে শুরু করে হাওরে। খবর পেয়ে আশপাশের গ্রামের কৃষকরা বাঁধে ছুটে যান। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর তারা সেখানে বাঁশ কুপে, মাঠির বস্তা ফেলে ভাঙন অংশ বন্ধ করতে সক্ষম হন। এর আগে প্রায় দুই ঘণ্টা ভাঙন অংশ দিয়ে পানি ঢুকে বেশ কিছু নিচু জমি ডুবে গেছে। এই হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধানকে নিয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে উৎকণ্ঠায় কৃষকরা।

তারা বলেছেন, অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হাওরের সবচেয়ে বড় বাঁধ উতারিয়া এখন তাদের ‘গলার কাঁটা’। এই বাঁধের কারণে গেল কয়েক দিনের বৃষ্টিতে দরিয়াবাজ অংশের ফসল ডুবে গেছে। শনিবার হাওরের গুজাউনি বাঁধ ভেঙে আরেকাংশ (মেলাউনি হাওর) ডুবতে থাকে।

এদিকে জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, যে বাঁধটি ভেঙেছে সেটি পানি উন্নয়ন বোর্ডে ও ফসল রক্ষা বাঁধের আওতাভুক্ত নয়। বৃষ্টিতে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে বাঁধ কাটার খবর পাওয়া গেছে। এই বাঁধের বিষয়ে কৃষকদের পক্ষ থেকে আগে থেকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। আগে থেকে জানা গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতো।

কৃষকের চেষ্টায় আপাতত বাঁধের ভাঙন ঠেকানো গেলেও একাংশে জলাবদ্ধতার যে পরিমাণ পানি আটকা আছে, তাতে অপরাংশ রক্ষা করা কঠিন জানিয়েছেন কৃষকরা।

স্থানীয় লোকজন জানান, শনিবার সকালের দিকে দেখার হাওরের মাঝখানে গুজাউনি বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি ঢুকা শুরু হয় হাওরে। এসময় কৃষকদের চিৎকারে বিভিন্ন গ্রাম থেকে হাজারো কৃষক বাঁশ, টুকরি, কুদাল নিয়ে ভাঙনস্থলে এসে বাঁধ ঠেকানোর চেষ্টায় নামেন। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় বাঁধের ভাঙন রোধ  হয়। পরে স্বস্তি ফিরে আসে কৃষকদের মধ্যে।

স্থানীয় বাসিন্দা আমিন উদ্দিন বলেন, ‘আমরা তাৎক্ষণিকভাবে এলাকাবাসীকে বাঁশ, বস্তা নিয়ে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানাই। কিন্তু বাঁধটি হাওরের গভীরে। তাই লোকজন জড়ো হতে ঘণ্টাখানেক সময় লেগে যায়। স্থানীয় হাজারো কৃষক জড়ো হয়ে ৪ ঘণ্টার চেষ্টায় বাঁধে কাজ করে সেটি রক্ষা করি।’

আস্তমা গ্রামের কৃষক মহিব মিয়া (৫০) জানান, মেলানি হাওরে তার ১২ কেদার (৩০ শতকে এক কেদার) জমি আছে। এ বাঁধ ভাঙায় সব ধান তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘উতারিয়া বাঁধের পানি নিষ্কাশনের নালাটি খোলা থাকলে এ বাঁধ ভাঙত না। আমাদের ফসলের ক্ষতি হতো না।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেখার হাওরে সদর, শান্তিগঞ্জ, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলার মানুষের জমি আছে। এ হাওরে মোট জমির পরিমাণ ৪৫ হাজার ৮৫৯ হেক্টর। এর মধ্যে আবাদি জমি ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টর। হাওরে এবার অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ঝাওয়া, শেয়ালমারা, গুমরাসহ কয়েকটি জায়গায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

পাউবোর সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, ‘যে বাঁধটি দিয়ে পানি প্রবেশ করেছে, সেটি আমাদের কোনো বাঁধ নয়, আমরা এখানে কোনো কাজও করিনি। স্থানীয়রা এখানে প্রয়োজনে কাজ করেন। আমি শুনেছি বৃষ্টি পানির চাপে বাঁধটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেছেন, তিনি বিষয়টি শুনেছেন। বাঁধটির যাতে আর ক্ষতি না হয় সেই ব্যবস্থা করা হবে।