"মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।" -অতীতেরভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তিও সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় আবার এলো নতুন বছর। আজ মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখ। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। নতুন বছর আবাহনে মঙ্গলবার এক সর্বজনীন প্রাণের উৎসবে মেতে উঠবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব মানুষ।
বর্ষবরণ উৎসব উদ্যাপনের লক্ষ্যে আজ মঙ্গলবার দেশব্যাপী নানামাত্রিক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর একটি স্বস্তিকর গণতান্ত্রিক পরিবেশে এবার নতুন বছরকে বরণ করা হবে। যদিও বৈশিকভাবে দেশে-দেশে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে একটি অস্বস্তিকর পরিবেশ বিরাজ করছে। এ অবস্থায় শান্তির বার্তা নিয়ে আসছে নতুন বছর। কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী বাঙালিরা যে যেখানে আছেন এ উৎসব উদযাপন করবেন। একই সঙ্গে পার্বত্য জনপদের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীরমানুষ নিজ নিজ ঐতিহ্যবাহী রীতিতে বর্ষবরণ উৎসব উদযাপন করবেন।
এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীকে জানিয়েছেন। শুভেচ্ছা
কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হিসেবে উদযাপিত হয় নববর্ষ। এক সময় নববর্ষ উদযাপিত হতো ঋতুধর্মী লোকজ উৎসব হিসেবে। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল
কৃষির, কারণ কৃষিকাজ ছিল ঋতুনির্ভর। বাংলা পিডিয়ার তথ্য অনুসারে, কৃষিকাজের সুবিধার্থেই মুগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তার সিংহাসন-আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬)। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসনকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। নতুন সনটি প্রথমে 'ফসলি সন' নামে পরিচিত ছিল, পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়।
আকবরের সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীরা খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো।
এক পর্যায়ে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব হয়ে ওঠে হালখাতা। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাদের পুরানো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের মিষ্টিমুখ করা হয়। গ্রামের সাধারণ মানুষ এ দিনে বাড়িঘর পরিষ্কার রাখে, ব্যবহার্য সামগ্রী ধোয়ামোছা করে
করেন। ভালো খাওয়া, নতুন পোশাক পরার রীতিও চালু রয়েছে। নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় সামাজিক বন্ধনের একটি অংশ হয়ে উঠেছে।
নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। লোকশিল্পজাত নানা পণ্য সামগ্রী মেলায় পাওয়া যায়। এছাড়া বিভিন্ন লোকজ খাদ্যদ্রব্য যেমন: চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা, বিভিন্ন প্রকার মিষ্টি প্রভৃতির বৈচিত্র্যময় সমারোহ থাকে মেলায়। লোক গানসহ বিনোদনেরও আয়োজন থাকে।
রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে বৈশাখি মেলা। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এর আয়োজনে শুরু হয়েছে 'বৈশাখী মেলা ১৪৩৩'। শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশচীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই)।
চৈত্রসংক্রান্তিতে নেত্রকোনায় শুরু হয়েছে 'খনার মেলা' এবং চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার চুহুর খান হাটে বৈশাখি মেলা।
কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরানো উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে, আবার সংযোগ ঘটেছে অনেক নতুন উৎসবের। এক সময়ের গ্রামীণ এ উৎসবটি এখন নাগরিক উৎসব হয়ে উঠেছে। বর্তমানে নগরজীবনে নগর-সংস্কৃতির আদলে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে নববর্ষ উৎযাপিত হয়। এ দিনটি বাংলাদেশে নববর্ষ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপিত হয়। এ দিন রাষ্ট্রীয় ছুটি থাকে।
আজ লোকজ মোটিফের পোশাক পরে নানা বয়সী মানুষ ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান উপভোগ করে দিন কাটাবেন। নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে তরুণীরা লালপেড়ে (প্রথম পাতার পর)
সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি, খোপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা এবং কপালে টিপ পরে; আর ছেলেরা পরে পাজামা ও পাঞ্জাবি। কেউ কেউ ধুতি-পাঞ্জাবিও পরে বের হবেন।
বর্ষবরণের বর্ণিল আয়োজন রয়েছে রাজধানীজুড়ে। উৎঘবের নগরীতে পরিণত হবে রাজধানী ঢাকা। নববর্ষের প্রথম প্রভাতে রমনার বটমূলে ছায়ানটের উদ্যোগে বরাবরের মতো রয়েছে প্রভাতী আয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলা থেকে বের হবে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখি শোভাযাত্রা। মঙ্গলশোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলি বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
আয়োজনমালার মধ্যে রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা ইত্যাদি।
বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল পহেলা বৈশাখের ওপর বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন। সংবাদপত্রগুলি বের করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়।
বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠী তাদের ঐতিহ্যবাহী রীতিতে তিন দিনের উৎসব আয়োজন করেছে। আজ নবর্ষকে বরণ করার মধ্য দিয়ে শেষ হবে তাদের তাদের আন্দন্দ আয়োজন।
রাষ্ট্রপতির শুভেচ্ছা: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শুভেচ্ছা বার্তায় বলেন, 'বাংলা নববর্ষ আমাদের প্রাণের সর্বজনীন উৎসব। এটি আমাদের ঐক্য, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ভেদাভেদ অতিক্রম করে পহেলা বৈশাখ আমাদের সবার জন্য হয়ে ওঠে এক আনন্দ ও মিলনের দিন।'
তিনি বলেন, 'বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় আজ আমরা নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এ প্রেক্ষাপটে আমাদের আরো সংযমী, ধৈর্যশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হবো-এই প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।'
প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুভেচ্ছা বার্তায় বলেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দিনটি আমাদের জীবনে প্রতি বছর ফিরে আসে নতুনের আহ্বান নিয়ে। নতুন বছরের আগমনে পুরোনো জীর্ণতা ও গ্লানি পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের জনগণের যার যার ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত সহনশীলতা, উদারতা ও সম্প্রীতির চর্চা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে এবং বহুমতের সহাবস্থানকে সুদৃঢ় করবে। বিশ্ব আজ নানা সংকট ও সংঘাতে বিপর্যস্ত। এই প্রেক্ষাপটে শান্তি, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। নববর্ষের এই শুভক্ষণে আমরা যেন সংকীর্ণতা ও স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবকল্যাণের পথ অনুসরণ করি-এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে আমরা অতীতের সব হতাশা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করি।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.