প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১৭:০৬ (রবিবার)
জরাজীর্ণ বিদ্যালয়কে প্রাণবন্ত করলো রোটারি ক্লাব

পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দন কুমিল্লা রেল স্টেশনের পাশেই দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে ছিল একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। একদিকে আধুনিক ও ঝকঝকে রেলস্টেশন, অন্যদিকে জরাজীর্ণ ও ভগ্নদশাগ্রস্ত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—এই বৈপরীত্য সহজেই যে কারও নজর কাড়ে। অবশেষে সেই অবহেলিত বিদ্যালয়টি নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে কুমিল্লা আড়ং রোটারি ক্লাবের মানবিক উদ্যোগে।


ঘটনার সূচনা হয় একটি সামাজিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। রোটারি ক্লাবের সদস্যরা একদিন ওই বিদ্যালয়প বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করতে যান। পরিবেশ সংরক্ষণের মতো মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সময় তাদের চোখে পড়ে বিদ্যালয়ের করুণ চিত্র। বিদ্যালয়ের ভবন ছিল জীর্ণ-শীর্ণ, দেয়ালগুলো ক্ষতিগ্রস্ত, শ্রেণিকক্ষ ছিল অস্বাস্থ্যকর এবং শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের মারাত্মক অভাব ছিল। বিষয়টি ক্লাব সদস্যদের গভীরভাবে নাড়া দেয়।


পরবর্তীতে এ বিষয়ে ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সবাই একমত হন যে, পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি শিক্ষা খাতের উন্নয়নেও তাদের দায়িত্ব রয়েছে। বিশেষ করে এমন একটি বিদ্যালয়, যেখানে ছোট ছোট শিশুরা প্রতিদিন শিক্ষাগ্রহণ করতে আসে, তাদের জন্য একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও আকর্ষণীয় পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।


এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেন ক্লাবটির চার্টার সভাপতি আব্দুল হালিম সরকার। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়নে আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছেন এবং এ ধরনের সমাজকল্যাণমূলক কাজ তার একান্ত অনুরাগের বিষয়। বিদ্যালয়ের দুরবস্থার কথা জানার পর তিনি দ্রুত এগিয়ে আসেন এবং সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।


তার নেতৃত্বে শুরু হয় বিদ্যালয়ের সার্বিক সংস্কার কাজ। প্রায় ১৩ লাখ টাকারও বেশি ব্যয়ে বিদ্যালয়টির ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়। সংস্কারের আওতায় ভবনের মেরামত, নতুন রং করা, শ্রেণিকক্ষ উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী বসার ব্যবস্থা তৈরি, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করা হয়। ফলে বিদ্যালয়টির সামগ্রিক চিত্রে এসেছে আমূল পরিবর্তন।


স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকরা এই উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, আগে বিদ্যালয়ের পরিবেশ শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকূল ছিল না, ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ত। কিন্তু এখন নতুন পরিবেশে শিক্ষার্থীরা আগ্রহের সঙ্গে বিদ্যালয়ে আসছে এবং তাদের শিক্ষার মান উন্নত হচ্ছে।


বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, আগে অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হতো। এখন সংস্কারকৃত পরিবেশে তারা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে পাঠদান করতে পারছেন এবং শিক্ষার্থীরাও মনোযোগসহকারে পাঠ গ্রহণ করছে।


রোটারি ক্লাবের সদস্যরা এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, সমাজের কল্যাণে এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ—এই তিনটি খাতে তারা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।


এই উদ্যোগটি কেবল একটি বিদ্যালয়ের উন্নয়ন নয়; এটি সামাজিক দায়বদ্ধতা, নেতৃত্ব এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করে যে, সদিচ্ছা ও সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে সমাজের যেকোনো সমস্যার ইতিবাচক সমাধান সম্ভব।


বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে শিক্ষা খাতের উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি বেসরকারি ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে রোটারি ক্লাব অব কুমিল্লা আড়ং-এর এই উদ্যোগ একটি অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।


স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এই উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়েছে। তারা মনে করেন, এ ধরনের সামাজিক সংগঠনগুলো যদি আরও এগিয়ে আসে, তবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।


কুমিল্লার এই বিদ্যালয়ের নবজাগরণ একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, একটি ছোট উদ্যোগ থেকেও বড় পরিবর্তন সম্ভব। রোটারি ক্লাবের এই মানবিক প্রয়াস ভবিষ্যতে আরও অনেক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।