গত ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে নয়াপল্টনে বিএনপি আয়োজিত শ্রমিক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ও পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। বক্তব্যে শিমুল বিশ্বাস দাবি করেন, ‘সারা দুনিয়াতে আজকের এই দিবস পালিত হচ্ছে। ভাগ্যহত মেহনতি মানুষের জাগরণের দিন। এই দিন প্রথম পালন করেছিলেন ১৯৭৯ সালে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।..’
এরূপ দাবি সংবলিত শিমুল বিশ্বাসের বক্তব্যের ভিডিও দেখুন: এখানে।
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান মে দিবস সর্বপ্রথম পালন করেননি। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান মে দিবস পালন করেছেন এবং এ দিবস উপলক্ষে ভাষণও দিয়েছেন। বিশ্বের নানা দেশে এ দিবস পালন শুরু হয় ১৮৯০ সাল থেকেই।
মে দিবসের ইতিহাসের বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৮৮৬ সালের ১ মে, আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আমেরিকার লক্ষ লক্ষ শ্রমিক একটি সাধারণ ধর্মঘট শুরু করেন, যা শিকাগোর ঐতিহাসিক হে-মার্কেট ঘটনার সূত্রপাত ঘটায়। ১৮৮৯ সালে সমাজতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ‘সেকেন্ড ইন্টারন্যাশনাল’, শ্রমিকদের সমর্থনে এবং হে-মার্কেট দাঙ্গার স্মরণে ১ মে-কে শ্রমিকদের সংহতি জানানোর দিন হিসেবে নির্ধারণ করে। এরপর থেকে এটি শ্রম অধিকার এবং শ্রমজীবী মানুষের ঐতিহাসিক অর্জনকে সম্মান জানানোর জন্য বিশ্বের নানা দেশে পালিত হয়।
বাংলাদেশে সর্বপ্রথম কবে মে দিবস পালিত হয়েছে এ বিষয়ে অনুসন্ধানে পুরোনো পত্রিকার অনলাইন সংরক্ষণাগার সংগ্রামের নোটবুক এর ওয়েবসাইটে ‘১ মে ১৯৭২, দৈনিক বাংলা দিনলিপি বঙ্গবন্ধুর শাসন সময় ১৯৭২, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ’ এর রেফারেন্স ১৯৭২ সালের ১ মে তারিখে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ পাওয়া যায়। ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমার প্রিয় শ্রমজীবী ভাই ও বোনেরা, স্বাধীন বাংলার মুক্ত মাটিতে এবারই সর্বপ্রথম ঐতিহাসিক মে দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলার মেহনতী মানুষ শৃঙ্খলমুক্ত পরিবেশে এই দিনটিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করার অধিকার অর্জন করেছে, এই জন্য দেশ ও জাতি আজ গর্বিত। মহান মে দিবস এর মানুষের অধিকার আদায়ের এক জ্বলন্ত প্রতীক। সারা বিশ্বের শোষিত বঞ্চিত নীপিড়িত মানুষের জন্য আজকের এই দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।..’
এছাড়াও, ১৯৭২ সালের ৩ মে তারিখে প্রকাশিত ইত্তেফাক পত্রিকায় ‘মে দিবসে মেহনতী জনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর সওগাত| নিম্ন বেতনভুকদের অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা মঞ্জুর’ শিরোনামে প্রচারিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গত সোমবারে মহান মে দিবসে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত এক বেতার ও টেলিভিশন ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিম্ন বেতনভুক সরকারী ও বেসরকারী কর্মচারীদের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থারূপে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধাদানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন এবং এই উপলক্ষে সমাজতন্ত্রী অর্থনীতি গড়িয়া তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার জন্য শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানান।’
এছাড়াও, ইত্তেফাকের উক্ত পত্রিকায় ‘মুক্ত বাংলায় প্রথম মে দিবস উদযাপিত’ শিরোনামে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ‘বিশ্বের মেহনতী মানুষের সহিত একাত্মতা ঘোষণা এবং পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ, জোতদার এবং ইহাদের জনক সাম্রাজ্যবাদের সকল চক্রান্ত ব্যর্থ করিয়া দিয়া বঙ্গবন্ধুর সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কর্মসূচী সফল করিয়া তোলার অগ্নিশপথ গ্রহণের মাধ্যমে গত সোমবার গণপ্রজাতন্ত্রী স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার রাজধানীসহ সারা দেশে ঐতিহাসিক মে দিবস পালিত হয়।..’
পাশাপাশি অনুসন্ধানে ১৯৭৩ সালের ৩ মে তারিখে প্রকাশিত ইত্তেফাক পত্রিকায় ‘যথাযোগ্য মর্যাদায় মে দিবস পালিত’ শিরোনামে প্রচারিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গত মঙ্গলবার পরিপূর্ণ মর্যাদার সহিত দেশের সর্বত্র ঐতিহাসিক মে দিবস প্রতিপালিত হয়। দেশের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এই মহান দিনে একটি শোষণমুক্ত সুখী ও সমৃদ্ধিশালী সমাজ প্রতিষ্ঠার দৃঢ়প্রত্যয় ঘোষণা করে।.. মহান মে দিবস উপলক্ষে সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়।..’
অর্থাৎ, উপরোক্ত তথ্যপ্রমাণ থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশে ১৯৭৯ সালের আগেও মে দিবস পালিত হয়েছে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ১৯৭২ সালে মে দিবস পালিত হয় এবং সেসময় ক্ষমতায় ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান।
সুতরাং, ১৯৭৯ সালে মে দিবস প্রথম পালন করেছিলেন জিয়াউর রহমান শীর্ষক দাবিটি মিথ্যা।
সূত্র: রোমার স্ক্যানার
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.