প্রকাশিত: ১৫ মে, ২০২৬ ১৭:৪৫ (রবিবার)
খামারি থেকে ট্যানারি পর্যন্ত অনিশ্চয়তা

ঈদের আনন্দ যখন দুয়ারে, তখন সিলেটের খামারি, চামড়া ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা এবং সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আসা ভারতীয় গবাদি পশুর ঢল এবং কওমি মাদ্রাসাগুলোর কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণা, চামড়া বয়বসায়ীদের বিনিয়োগ না করাÑ এই তিন সংকট মিলে তৈরি করেছে এক কঠিন বাস্তবতা। পশুর বাজার থেকে শুরু করে চামড়া শিল্প পর্যন্ত সর্বত্র এখন অনিশ্চয়তার ছায়া। 


এই ত্রিমুখী সংকট খামারি থেকে এতিমখানা, ট্যানারি থেকে সাধারণ মানুষÑ সবার এখন উদ্বেগ। সিন্ডিকেট ভেঙে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে না পারলে এবারের কোরবানির অর্থনীতি বড় ধরনের বিশৃঙ্খলায় রূপ নিতে পারে। 


সিলেটের কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন রাত থেকে ভোর পর্যন্ত শত শত ভারতীয় গরু ও মহিষ অবৈধভাবে প্রবেশ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী চক্র এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশে এসব পশু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের চেকপোস্টের সামনে দিয়েই এসব গাড়ি চলে গেলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। 


ফলে সারা বছর ধার-দেনা করে পশু লালন-পালন করা প্রান্তিক খামারিরা এখন ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে চরম সংশয়ে। জেলার অর্ধশতাধিক পশুর হাটের ইজারাদাররাও লোকসানের ঝুঁকিতে। 


এক ক্ষুব্ধ খামারি জুনেল আহমদ বলেনÑ ‘লাভের আশায় গরু বড় করলাম, এখন ভারতীয় গরুতে বাজার সয়লাব। আমাদের আসল টাকা উঠবে কি না, তা নিয়েই আমরা চিন্তিত।’ 
যদিও সিলেট জেলা পুলিশ দাবি করছে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। 


অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেলুর রহমান জানিয়েছেন, চোরাচালান দমনে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং কোনো পুলিশ সদস্যের অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 


এদিকে, দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার প্রতিবাদে এবার সিলেট বিভাগের কওমি মাদ্রাসাগুলো কোরবানির চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণা দিয়েছে। সম্প্রতি ‘সিলেট কওমি মাদ্রাসা সংরক্ষণ পরিষদ’ এক সংবাদ সম্মেলনে এই সিদ্ধান্ত জানায়। 


দেশে কোরবানির মোট চামড়ার প্রায় ৭০ শতাংশ সংগ্রহ করে থাকে কওমি মাদ্রাসাগুলো। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, চামড়া বিক্রি করে লবণের খরচও ওঠে না। সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। 


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদ্রাসাগুলোর এই সিদ্ধান্তে তিন ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে (১) পরিবেশ দূষণ: চামড়া যত্রতত্র পড়ে থেকে পচে দুর্গন্ধ ছড়াতে পারে। (২) এতিমখানার সংকট: মাদ্রাসার ‘লিল্লাহ ফান্ড’ বা এতিম তহবিলের বড় অংশ আসত চামড়া বিক্রির অর্থ থেকে। এবার তা বন্ধ হলে হাজার হাজার এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীর খাবার ও আশ্রয় হুমকির মুখে পড়বে। (৩) ট্যানারি বিপর্যয়: কাঁচা চামড়া সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে ট্যানারিগুলো কাঁচামাল সংকটে পড়বে এবং জাতীয় সম্পদের বিশাল অপচয় ঘটবে। 


সিলেটের চামড়া ব্যবসায়ী শাহজাহান মিয়া বলেনÑ ‘ট্যানারি মালিকদের কাছে কোটি কোটি টাকা বকেয়া। এই টাকা না পাইলে ব্যবসা করবো কী দিয়ে? গত ১৬ বছর ধরে আমরা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ধুঁকে ধুঁকে শেষ হয়ে যাচ্ছি। সরকার বদলায় কিন্তু চামড়ার সিন্ডেকেট বদলায় না।’ 


তিনি আরও জানান, স্থানীয় পর্যায়ে একসময় ১৫০ থেকে ২০০ জন ব্যবসায়ী ছিলেন। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ থেকে ২০ জনে। এভাবে চলতে থাকলে তারাও ব্যবসা বাদ দিতে বাধ্য হবেন। 


শাহজালাল চামড়া সমিতির আহ্বায়ক মো. লিয়াকত আলী বলেনÑ ‘আমাদের প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা এখনও ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া পড়ে আছে। এ অবস্থায় নতুন করে বিনিয়োগ করার আগ্রহ নেই।’ 


বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বছর লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা এবং খাসির চামড়ায় ৩ টাকা বাড়িয়েছে। ঢাকায় গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। কিন্তু স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাস্তবে তারা চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হন নির্ধারিত দামের চারগুণ কমে। ফলে লোকসান গুনতে হয় তাদেরকেই। 


বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্পের সবচেয়ে বড় বাধা হলো এলডব্লিউজি সনদ। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত না থাকায় ট্যানারিগুলো ইউরোপ-আমেরিকায় চামড়া রপ্তানি করতে পারছে না। ফলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে বাংলাদেশের চামড়া বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। 


ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, সরকার যদি কাঁচা চামড়া রপ্তানির সুযোগ উন্মুক্ত করে দেয় তবে তারা ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই তা রপ্তানি করতে পারবেন। এতে মুনাফা কম হলেও ব্যবসায়ীরা বাঁচবেন। 


সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানিয়েছেন, ব্যবসায়ী ও কওমি মাদ্রাসাগুলোর সঙ্গে বৈঠক হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এবার লবণসহ বিভিন্ন সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। 


বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, মাঠ পর্যায়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় লবণ পৌঁছে দেওয়া হবে। চামড়া সঠিক উপায়ে সংরক্ষণের জন্য ইতিমধ্যেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রমে সরকারের প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় হবে।