প্রতিদিন ভোরে উঠে সিলেটের গৃহিণীরা একটাই প্রশ্নের মুখোমুখি হন আজ কি ময়লার ভ্যান আসবে? তিন দিন ধরে জমে থাকা বর্জ্যরে গন্ধে ঘর থেকে বের হওয়া দায়। অথচ মাস শেষে টাকা দিতে একটুও দেরি করলে ভ্যানওয়ালার চেঁচামেচিতে পাড়া মাথায় ওঠে। এটাই এখন সিলেট নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র। দায় নেই, দায়িত্ব নেই, শুধু টাকা আদায়ের তাগাদা।
অথচ সিলেট নগরীতে প্রতিদিন ৫০০ টন বর্জ্য উৎপাদিত হলেও তার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নেই, জবাবদিহিতা নেই, নীতিমালা নেই। আছে শুধু অনিয়মের ফাঁদে আটকা লাখো মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর মাস শেষে টাকা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা। ময়লার ভার বইছেন নগরবাসী। আর টাকার কারবার চলছে নিরবচ্ছিন্নভাবে।
জানা গেছে, সিলেট নগরীতে প্রতিদিন উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ৫০০ টন বর্জ্য। প্রায় এক লাখ হোল্ডিং এবং দশ লাখ মানুষের এই শহরে বর্জ্য অপসারণ হওয়ার কথা নিয়মিত, সুশৃঙ্খলভাবে। কিন্তু বাস্তবে উল্টো চিত্র।
সিটি করপোরেশনের ৪২টি ওয়ার্ডে প্রায় ৬০০টি ভ্যানগাড়ি বর্জ্য সংগ্রহের কাজ করছে।
এর কোনোটিই সিসিকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেই। চলছে স্থানীয় ক্লাব আর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইচ্ছেমতো। ফলে কোথাও প্রতিদিন ভ্যান আসে, কোথাও দুদিনে একবার, কোথাও আবার চারদিনেও দেখা নেই।
প্রতি বাড়ি থেকে মাসে আদায় হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টাকা নেওয়া হয় কোনো রসিদ ছাড়াই। হিসাব করলে দেখা যায়, এক লাখ হোল্ডিং থেকে মাসে আদায় হচ্ছে ৯০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কের অর্থের কোনো হিসাব নেই, কোনো জবাবদিহিতা নেই।
এখানেই শেষ নয়। আইনি জটিলতাও রয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশন আইনে বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের কোনো বিধানই নেই। এই ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে ক্লাব ও ব্যক্তিরা গড়ে তুলেছেন কোটি টাকার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসা।
সিসিকের পুরনো ২৭টি ওয়ার্ডে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হলেও নতুন সংযুক্ত ওয়ার্ডগুলোতে অবস্থা রীতিমতো বেহাল। ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হেলেনা বেগম বলেন, ‘আমাদের বাসা মূল সড়কের কাছেই, তবুও দুদিন পরপর ময়লা নেয়। যাদের বাসা গলির ভেতরে, তাদের অবস্থা আরও খারাপ।’
দক্ষিণ সুরমার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘টাকা দিতে একটু দেরি হলে চেঁচামেচি করে। কিন্তু তিন দিন ময়লা না নিলেও কারো কিছু বলার নেই। সিসিকের কোনো নজরদারি নেই এখানে।’
ড্রেনের পাশে ময়লার পাহাড়: বর্জ্য সংগ্রহের পরের চিত্রটিও কম উদ্বেগজনক নয়। ভ্যানগুলো বাড়ি থেকে বর্জ্য নিয়ে সরাসরি ডাম্পিং স্টেশনে না গিয়ে ফেলে রাখে ড্রেনের পাশে বা রাস্তার মোড়ে।
সিসিকের বড় ট্রাক না আসা পর্যন্ত সেই ময়লার স্তূপ পড়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দুর্গন্ধে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে চলতে হয় পথচারীদের। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অব্যবস্থাপনা মশাবাহিত রোগ ও পানিদূষণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সিসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখার প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) একলিম আবেদীন স্বীকার করেন যে অনিয়ম রয়েছে। তিনি জানান, ক্লাবগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে শিগগিরই কমিটি গঠন করা হবে এবং ‘প্রতিদিনের বর্জ্য প্রতিদিন’ সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে নগরবাসীর প্রশ্ন Ñ এই ‘শিগগির’ কবে আসবে? পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল অনেক আগেই। কিন্তু সেটি এখনো কাগজেই আটকে আছে।
সচেতন নগরবাসী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাধান অসম্ভব নয়। তবে তার জন্য চাই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। মাসিক ফি নির্ধারণ করে রসিদ ছাড়া টাকা আদায় বন্ধ করতে হবে। নিয়মিত তদারকি ও অনিয়মে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.