এক সপ্তাহ, কয়েকটি জেলা আর কয়েকটি ছোট্ট প্রাণ। কিন্তু প্রতিটি ঘটনাই যেন মানবতাকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ধারাবাহিক ঘটনায় দেশের মানুষ ক্ষোভে ফুঁসলেও আতঙ্ক কাটছে না কোনোভাবেই। যে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার কথা, খেলাধুলায় মেতে থাকার কথা, তারাই আজ বিকৃত মানসিকতার শিকার হয়ে হারাচ্ছে মূল্যবান প্রাণ।
সিলেট থেকে রাজধানীর পল্লবী পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনায় উঠে এসেছে সমাজের অন্ধকার চিত্র। প্রতিটি ঘটনার পর বিচার ও নিরাপত্তার দাবি উঠেছে। আবার ফিরে আসছে একই বিভীষিকা। ফলে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের শঙ্কা যেমন বাড়ছে, তেমনি গভীর হচ্ছে একটি প্রশ্ন— নিষ্পাপ শিশুদের ঝরে যাওয়ার দায় কার?
সিলেটে চার বছরের ফাহিমা
৬ মে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামে চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারকেও যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় প্রতিবেশী ও সম্পর্কে চাচা জাকির হোসেনকে গত সোমবার গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফাহিমাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করে মরদেহ ব্যাগে ভরে পাশের ডোবায় ফেলে দেয় জাকির। গত শুক্রবার শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী থানাঘেরাও করে। পরে অভিযুক্তের বাড়িতেও চালানো হয় হামলা।
ঠাকুরগাঁওয়ে ভুট্টাখেতে মিলল শিশুর লাশ
১৪ মে, ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় নবম শ্রেণির ছাত্র মুরসালিনকে আটক করেছে পুলিশ।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত বুধবার বিকেলে শিশুটিকে নিয়ে ঘুরতে দেখা যায় মুরসালিনকে। সন্ধ্যার পর শিশুটি নিখোঁজ হলে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। পরদিন সকালে স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদে মুরসালিন হত্যার কথা স্বীকার করলে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ভুট্টাখেত থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ধর্ষণের পর ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থেকেই শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জে সৎ মামার বিরুদ্ধে অভিযোগ
১৬ মে, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ১০ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার সৎ মামা রাজা মিয়ার বিরুদ্ধে। ১৪ মে, শনিবার বিকেলে নিজ ঘরের খাটের ওপর শিশুটির মরদেহ পাওয়া যায়।
পল্লবীতে ৮ বছরের রামিসা
১৯ মে, রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে হত্যা করা হয়েছে ধর্ষণের পর। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন আদালতে। গতকাল বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ তার জবানবন্দি রেকর্ড করে পাঠানোর নির্দেশ দেন কারাগারে।
একই মামলায় সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও পাঠানো হয়েছে কারাগারে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় রামিসাকে কৌশলে নিজেদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় অভিযুক্তরা। পরে পরিবারের সদস্যরা খোঁজ করতে গিয়ে সোহেল ও স্বপ্নার শোবার ঘরে রামিসার মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার করেন। পাশেই একটি বালতিতে পাওয়া যায় শিশুটির মাথা।
ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই রাজা মিয়া ওই পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাকে আটক করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে শিশুটিকে।
এদিকে সাম্প্রতিক ধর্ষণ ও শিশু হত্যার ঘটনা নিয়ে উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক বেড়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি চিন্তিত। একা স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা করা কিংবা প্রতিবেশীর বাসায় যাওয়ার মতো সাধারণ বিষয়গুলোও এখন অনেক অভিভাবকের কাছে উদ্বেগের কারণ। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার খবর দেখে আরও বাড়ছে তাদের আশঙ্কা।
অনেকেই বলছেন, অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে এই ভয় ও অনিশ্চয়তা কাটবে না। ফলে সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবারগুলোর মধ্যে বাড়তি সতর্কতা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ঢাকা উত্তরার বাসিন্দা ও দুই সন্তানের মা আমেনা আক্তারের সঙ্গে কথা হয়। বললেন, ‘সন্তানদের এখন একা বাইরে পাঠাতে ভয় লাগে। স্কুলে যাওয়া, খেলতে যাওয়া— এমনকি পাশের বাসায় যাওয়ার ক্ষেত্রেও দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। প্রতিদিন খবর খুললেই শিশু নির্যাতন বা হত্যার ঘটনা দেখি। একজন মা হিসেবে এটা খুবই আতঙ্কের। আমরা চাই, অপরাধীদের এমন শাস্তি হোক যাতে ভবিষ্যতে কেউ শিশুদের দিকে কুনজর দেওয়ার সাহস না পায়।’
ঢাকার পল্লবীর বাসিন্দা ও এক শিশুর বাবা রমজান আলী বলছেন, ‘সন্তান ঘর থেকে বের হলে এখন আর নিশ্চিন্ত থাকতে পারি না। আগে ভয় ছিল দুর্ঘটনার, এখন ভয় মানুষ নিয়েই। যারা শিশুদের ওপর এমন পাশবিক নির্যাতন চালায়, তাদের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। না হলে কমবে না অভিভাবকদের এই আতঙ্ক।’
শিশু অধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার চেয়ারম্যান মাহবুবা রহমান কাকলির ভাষ্য, ‘সাম্প্রতিক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাগুলোর পেছনে সামাজিক অবক্ষয় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বড় কারণ। অধিকাংশ ভুক্তভোগী নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ দেখছে।’
‘গত দেড় বছরে বহু শিশু ধর্ষণের ঘটনার বিচার না হওয়ায় অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু রাষ্ট্র নয়, পরিবার, সমাজ, স্কুল ও প্রতিবেশীকেও সমানভাবে দায়িত্ব নিতে হবে’, যোগ করেন তিনি।
মাহবুবা রহমান কাকলি বলছেন, ‘শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নৈতিক, সামাজিক ও মানবিক শিক্ষা জরুরি। একই সঙ্গে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় বিশেষ আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি কার্যকর করা গেলে এ ধরনের অপরাধ কমে আসবে অনেকাংশ।’
বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেই অপরাধীরা ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান।
তিনি বলছেন, ‘বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেই অপরাধীরা ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী বিচার পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে অনেক মানুষই সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’
‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয় না। তদন্ত ও ডিএনএ রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। পর্যাপ্ত ডিএনএ ল্যাব ও বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থার অভাবে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। যা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে তৈরি করছে হতাশা’, যোগ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, ‘নিজের মেয়েকে হারানোর পরও যখন একজন বাবা বলেন, ‘আমি বিচার চাই না’, তখন তা রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক। কিছু মামলা দ্রুত বিচার হলেও উচ্চ আদালতে মামলা জটের কারণে বছরের পর বছর লেগে যায়, ফলে বিচার বিলম্বিত হয়।’
বিচারটা সঠিকভাবে করা গেলে অপরাধের মাত্রা অনেকাংশই কমবে বলে মনে করেন ইশরাত হাসান। তার মতে, দৃষ্টান্তমূলক বিচার হলে ভয় পাবে অন্য অপরাধীরা। কিন্তু মানুষ বিচার পাচ্ছে না।
তার অভিযোগ, দেশে পর্যাপ্ত বিচারক ও আদালত নেই। প্রতিটি জেলায় ডিএনএ ল্যাব থাকা দরকার। তদন্তের জন্য বিশেষ এজেন্সি দরকার, যারা কেবল ধর্ষণ মামলাগুলো তদন্ত করবে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.