প্রকাশিত: ২৪ মে, ২০২৬ ১৪:০২ (বুধবার)
প্রতিশ্রুতি আছে, বরাদ্দ নেই

সিলেট অঞ্চলে বজ্রপাত যেন প্রতি বছরই কৃষকদের জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। গত তিন বছরে জেলায় বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৬ জন মানুষ, চলতি বছরেই আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই কৃষক—হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে কিংবা খোলা মাঠে কৃষিকাজের সময় বজ্রপাতের আঘাতে তারা প্রাণ হারান।  


দেশের মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে বছরে গড়ে ১৫ জনের মতো কৃষক মারা গেলেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। তবে বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার’ স্থাপনের জন্য সিলেটের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে সরকারকে প্রস্তাব করা হয়েছে এবং হাওরে বজ্রপাত নিরোধক আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপপ্তর। 

সিলেট জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সিলেট জেলায় গত তিন বছরে ৪৬ জন মারা গেছেন বজ্রপাতে। তাদের বেশিরভাগই কৃষক। তারা বজ্রপাতের সময় হাওরে মাছ ধরছিলেন, কেউ বজ্রপাতের সময় কৃষি কাজ করছিলেন। এ বছর আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে সিলেটে ১৫ জন মারা যান বজ্রপাতে। বছরের এপ্রিল, মে ও জুন মাসে সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় বজ্রপাত বেশি হয়। 

হাওর এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেটের হাওর এলাকার কৃষকরা আকাশে ঝড়ো বাতাস ও বজ্রপাতের সময়ও কৃষি কাজ করেন। তাদের মধ্যে সচেতনতা কম। আবার ওই সব হাওর এলাকায় তাল গাছ নেই। খোলা মাঠে অথবা হাওরের জলে মাছ ধরা ও কৃষি কাজে ব্যস্ত থাকা কৃষকেরা আকাশের অবস্থা  খারাপ থাকলেও কোথাও আশ্রয় নেন না। কারণ, বজ্রপাতের সময় ধারেকাছে তাদের বাড়ি থাকে না, হাওরেও কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নেই। আকাশে ঝড়ো হাওয়া ও বজ্রপাতের ঘনঘটা দেখেও তারা মাঠে কাজ করেন। এতে সিলেট ও সুনামগঞ্জে বজ্রপাতের সময় ঘন ঘন মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সিলেট ও সুনামগঞ্জে ঘন ঘন বজ্রপাতে মৃত্যুর কারণে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে, দুর্যোগপূর্ণ হাওর এলাকার মসজিদে বজ্রপাতের মৌসুমে মাইকে বিশেষ সতর্কতা ঘোষণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটছে এমন হাওরে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হচ্ছে। হাওরে খোলা হবে কিছু শেড। এসব শেডে বজ্রপাতের মুহুর্তে কৃষকরা এসে আশ্রয় নিতে পারবেন। 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সূত্র আরও জানায়, সিলেট ও সুনামগঞ্জে বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার’ স্থাপন প্রকল্প গ্রহণের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত নিরোধক যন্ত্র বরাদ্দ করা হচ্ছে না। অথচ, এ বছরও চলতি এপ্রিল-মে মাসে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা শুরু হয়েছে। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছর সিলেট অঞ্চলে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জনের বেশি মানুষ বজ্রপাতের শিকার হয়ে মারা যান। সিলেট সদরে ও বিভিন্ন উপজেলায় আম কুড়ানো, মাঠে কাজ করা বা গবাদি পশু আনতে গিয়ে প্রতি বছর একাধিক মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। জৈন্তাপুর উপজেলাতেই একদিনে বজ্রপাতে ৩ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর রেকর্ড রয়েছে। সুনামগঞ্জ হাওর অঞ্চল হওয়ায় ধান কাটা বা হাওরে কাজ করার সময় বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি। শুধু সিলেট বিভাগের হাওর এলাকাগুলোতে বছরের বিভিন্ন সময়ে বজ্রপাতে একসাথে ৪ থেকে ৬ জন কৃষকের মৃত্যুর মতো বড় দুর্ঘটনাও ঘটেছে। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন মাসের প্রাক-মৌসুমি বৃষ্টিপাত এবং কালবৈশাখী ঝড়ের সময় বজ্রপাতের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর বলছে, বজ্রপাতের সময় বিদ্যুতের খুঁটি, বড় গাছ , খোলা আকাশের নিচে থাকা যাবে না এবং হাওরে মাছ ধরা যাবে না। এসব বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে মসজিদের মাইকিংয়ের পাশাপাশি স্কুলেও গিয়ে সচেতন করা হচ্ছে। কিন্তু সিলেটে কৃষকদের মধ্যে বজ্রপাত নিয়ে তেমন সচেনতা তৈরি হচ্ছে না। যে কারণে, প্রতি বছর বজ্রপাত মৌসুমের তিন মাসে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন কৃষক মারা যাচ্ছেন। 

জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সিলেট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল কুদ্দুস বুলবুল বলেন,‘ বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র ‘ লাইটনিং অ্যারেস্টার’ বরাদ্দ দেওয়ার জন্য আমরা সরকারের কাছে প্রস্তাব করেছি, কিন্তু এখনও কোনো বরাদ্দ আসেনি। তবে কিছুদিনের মধ্যে বজ্রপাতের হাওর এলাকায় আমরা আশ্রয়কেন্দ্র বা শেড নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছি। আকাশে ঝড়ো হাওয়া শুরু হলে কৃষকরা দ্রুত এসব শেডের নিচে আশ্রয় নিতে পারবেন। পাশাপাশি আমরা হাওর এলাকার মসজিদে যাচ্ছি, কৃষকদের সচেতন করছি।’

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন,‘ প্রতি বছর সিলেট ও সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে কৃষকরা মারা যাচ্ছে। এই কৃষকরা আমাদের খাবার জোগাচ্ছে, কিন্তু তাদের নিরাপত্তার কথা আমরা ভাবছি না। বজ্রপাতে কৃষক মারা গেলেও ২০ হাজার টাকা ত্রাণ দিয়েই দায় শেষ করা হচ্ছে। কিন্তু কৃষকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সরকারি ও এনজিও ভিত্তিক কিছু স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ করা জরুরি।’