“একটা মানবদেহ যেমন পেট ছাড়া চিন্তা করা যায় না, তেমনি পুকুর বা জলাধার ছাড়া একটি আদর্শ নগরীও চিন্তা করা যায় না। আমরা নগরের সেই পেটটাই কেটে ফেলেছি। এই বক্তব্য শাবিপ্রবি সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের
অধ্যাপক ড. মো. জহির বিন আলমের।
নগরীর নাম ছিল সিলেট, কিন্তু পরিচিতি ছিল ‘দীঘির শহর’ নামে। প্রতিটি মহল্লা, পাড়া কিংবা অভিজাত বাড়ির সামনে থাকত এক বা একাধিক টলটলে জলের পুকুর কিংবা বিশাল দীঘি। যা কেবল পানির উৎসই ছিল না, ছিল নগরের ফুসফুস ও বৃষ্টির পানি ধারণের প্রধান প্রাকৃতিক জলাধার।
কিন্তু তিন দশকের ব্যবধানে সেই ঐতিহ্য এখন কেবলই ইতিহাস। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন ব্যবসার আগ্রাসী বিস্তার, দখল আর দূষণের করাল গ্রাসে গত ৩০ বছরে সিলেট মহানগরী থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় আড়াইশ’ পুকুর ও দীঘি। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী জলাশয়গুলো ভরাট করে আজ গড়ে উঠেছে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন ও আবাসিক এলাকায়। আর এর চড়া মূল্য দিচ্ছে নগরবাসী। সামান্য কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই এখন জিন্দাবাজার, চৌহাটৃটাজ, সুবিদবাজার কিংবা উপশহরের মতো এলাকাগুলো রূপ নিচ্ছে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানির নরকে।
পরিসংখ্যানের ভয়াবহ চিত্র: ৮০-৮৫% জলাশয় উধাও পরিবেশবাদী সংগঠন, সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক) এবং স্থানীয় প্রবীণদের তথ্য বিশ্লেষণে এক ভয়ঙ্কর চিত্র সামনে এসেছে। নব্বইয়ের দশক: সিলেট শহরে ছোট-বড় মিলিয়ে পুকুর ও দীঘি ছিল প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০টি। বর্তমান চিত্র (সিসিক হিসাব): সরকারি খতিয়ানে অবশিষ্ট আছে মাত্র ২৮টি পুকুর-দীঘি।
বেলার জরিপ: বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-র মতে, টিকে আছে মাত্র ৩৬টি।
ক্ষতির পরিমাণ: গত ৩০ বছরে সিলেট মহানগরী তার প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ জলাশয় হারিয়েছে।
বর্তমানে সিসিকের আয়তন ৭৯.৫০ বর্গকিলোমিটার। আদর্শ নগর পরিকল্পনানুযায়ী একটি শহরের অন্তত ১০ থেকে ১২ শতাংশ জলাভূমি থাকা প্রয়োজন। অথচ পরিবেশ আন্দোলনের মাঠপর্যায়ের গবেষণা বলছে, ছড়া, খাল ও পুকুর মিলিয়ে সিলেটে এখন জলাভূমি রয়েছে মাত্র ৫.৪৯ বর্গকিলোমিটার, যা মোট আয়তনের মাত্র ৬.৯১ শতাংশ।
নাম আছে, নদী-দীঘি নেই: ইতিহাসের বিলুপ্তি
সিলেটের বহু এলাকার নাম আজ কেবলই স্মৃতির কঙ্কাল বহন করছে। লালদীঘির পাড়, সাগরদীঘির পাড়, রামের দীঘির পাড়, চারাদীঘির পাড়, মাছুদীঘির পাড় কিংবা ধোপাদীঘির পাড়Ñএসব নাম এখনো মানুষের মুখে মুখে ফিরলেও বাস্তবে অধিকাংশ দীঘির অস্তিত্ব বিলীন।
চারাদীঘি ও রামের দীঘি: সম্পূর্ণ ভরাট করে গড়ে উঠেছে বহুতল বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন।
মাছুদীঘি ও সাধুবাবুর দীঘি: এখন কেবলই প্রবীণদের স্মৃতিচারণ।
লালদীঘি ও সাগরদীঘি: চারপাশ দখল হয়ে ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকায় রূপ নিয়েছে।
বিলুপ্তির তালিকায় আরও: তালতলা দীঘি, রাজার-মার দীঘি, টিবি হাসপাতাল দীঘি এবং ভার্থখলা বড়বাড়ির পুকুর।
নগরের দাড়িয়াপাড়া এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আবদুল মজিদ (৭৭) আঙুল গুনে শোনালেন অতীত, “আমাদের দাড়িয়াপাড়া আর তার আশপাশেই প্রায় ৪৮টা ছোট-বড় পুকুর ছিল। কারো কারো বাড়িতেই থাকত দুইটা করে পুকুর। তখন তো পৌরসভায় সাপ্লাই পানি ছিল না, পুকুরই ছিল ভরসা। যুগ বদলাল, পুকুর ভরাট করে দালান উঠল। এখন এই পাড়ায় একটা পুকুরও খুঁজে পাওয়া দায়।”
প্রবাসী আয় ও আবাসন খাতের ‘ভেলা’
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৯৫ সালের পর থেকে সিলেটে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) বৃদ্ধির ফলে আবাসন খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে। জমির মূল্য রাতারাতি কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুর ও দীঘি ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণকে সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে বেছে নেন মালিকেরা। এর সাথে যোগ হয় সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ও রাস্তা সম্প্রসারণের নামে জলাশয় সংকোচনের হিড়িক।
পরিবেশবাদী নাগরিক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’-র সদস্য সচিব আবদুল করিম কিম বলেন, “২০০২ সালে পৌরসভা থেকে সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরের পরই মূলত শুরু হয় ধ্বংসযজ্ঞ। সবুজ টিলা কাটার মাটি দিয়ে ভরাট হতে থাকে একের পর এক পুকুর-দীঘি। লামাবাজার-বিলপাড়ের মুক্তার বিল, কাজল হাওর কিংবা জল্লারপাড়ের জল্লাÑএসবের আজ আর কোনো অস্তিত্ব নেই। অন্তত ৬০ শতাংশ প্রাকৃতিক জলাভূমি এই রূপান্তরের নামে গিলে খাওয়া হয়েছে।”
সংরক্ষণের নামে ‘টাকা লোপাট’ ও আয়তন সংকোচন অভিযোগ উঠেছে, সিসিক ও বিভিন্ন মহলের উদ্যোগে কিছু ক্ষেত্রে পুকুর সংরক্ষণ ও সংস্কারের নামে উল্টো জলাশয়ের আয়তন কমিয়ে ফেলা হয়েছে। রাস্তা প্রশস্তকরণ ও ওয়াকওয়ে নির্মাণের নামে বহু পুকুরের ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অংশ ভরাট করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক কাজীদীঘি (হজরত কাজী জালাল উদ্দিন রহ.-এর দীঘি) একসময় ছিল ১১০ শতক জায়গাজুড়ে। কিন্তু সংস্কার আর চারপাশের দখলের কারণে সেটি এখন সংকুচিত হয়ে ক্ষাণিকটা ডোভায় পরিণত হয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে রায়নগরের সোনারপাড়া মসজিদসংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী পুকুরের ক্ষেত্রেও। সংস্কারের নামে সেটি এখন ভরাট করে বহুতল মার্কেট নির্মাণের পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
কাজ করেনি বিশেষ কমিটি, আইনি মারপ্যাঁচে সিসিক
পরিবেশবাদীদের দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০২০ সালের ১০ নভেম্বর সিসিক পুকুর ও দীঘি সংরক্ষণের জন্য নগর পরিকল্পনাবিদ মো. তানভীর রহমান মোল্লাকে আহ্বায়ক করে ৬ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। কমিটির দায়িত্ব ছিল জলাশয়ের ডিজিটাল তালিকা তৈরি ও সংরক্ষণ। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কমিটি গঠনের পর প্রথম এক বছরে মাত্র একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। মাঠপর্যায়ে কোনো নজরদারি না থাকায় কমিটির তালিকাভুক্ত পুকুরও ভরাট হয়ে গেছে।
জলাশয় উদ্ধারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মালিকানা সংক্রান্ত আইনি জটিলতা। বেলার বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা আখতার জানান, “তেররতন এলাকার প্রায় ৮০০ বছরের পুরোনো একটি দীঘি উদ্ধার করতে গিয়ে সিসিক আইনি জটিলতায় পড়ে, কারণ স্থানীয় একটি পক্ষ এটিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন দাবি করে মামলা করে। আবার গোলাপগঞ্জের ঢাকাদক্ষিণ জমিদার পুকুর ভরাট করে দোকানঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে আমরা আদালতে যাই। পরে হাইকোর্ট স্থিতাবস্থা জারি করেন।”
কাগজে আইন, বাস্তবে প্রয়োগ শূন্য বাংলাদেশে পুকুর বা জলাশয় ভরাট করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও সিলেটে আইন প্রয়োগের কোনো দেখাই নেই।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.