চোখের সামনে একের পর এক তলিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি, চেনা সড়ক, আর শৈশবের স্মৃতি জড়ানো আঙিনা। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর সুরমা নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বুকজুড়ে শুরু হয়েছে এক নির্মম খেলা। তীব্র নদীভাঙনে জকিগঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের চোখে এখন শুধুই বুকফাটা আর্তি আর ঘরবাড়ি হারানোর আতঙ্ক। নদীপাড়ের গ্রাম, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো এখন নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।
সবচেয়ে বুকভাঙা দৃশ্য মানিকপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সুরানন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গেলে চোখে পড়ে। ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত, এই অঞ্চলের শিক্ষার আলো ছড়ানো শত বছরের প্রাচীন বিদ্যাপীঠটির ঠিক কোল ঘেঁষেই এখন গর্জন করছে সুরমা। রসুলপুর, দুধরচক, শিবেরচক, হরাইচক ও সুরানন্দপুর গ্রামের শতাধিক শিশুর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে এই স্কুলের সঙ্গে।
ভাঙন যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো মুহূর্তে নদী কেড়ে নেবে শিশুদের এই প্রিয় আঙিনা। বন্ধ হয়ে যাবে শতাধিক শিক্ষার্থীর পড়ালেখা, হুমকির মুখে পড়বে তাদের জীবন। জন্মমাটির এই বিপন্ন রূপ দেখে দূর পর্তুগাল থেকেও কেঁদে উঠেছে সুরানন্দপুর প্রবাসী ফোরামের সভাপতি জুবায়ের আহমদের মন। তিনি আকুল কণ্ঠে বলেন, নদীভাঙন তাদের গ্রামের সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোকে একবারে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছে। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু জোড়াতালির কাজ নয়, অবিলম্বে টেকসই স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ দরকার।
এদিকে মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুস শহীদ জানান, বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে এবং আগামী সমন্বয় সভায় এটি গুরুত্বের সঙ্গে তোলা হবে। জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুজিত কুমার চন্দ জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দেখার পরপরই তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীকে চিঠি পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের কাছেও আবেদন পাঠানো হচ্ছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
তবে জকিগঞ্জের এই ক্ষত শুধু এক জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়। একে একে ভাঙনের মুখে পড়েছে বিরশ্রী ইউনিয়নের পিয়াইপুর, কোনারগাও, মালীপাড়া, বারজনী; বারহাল ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের চক কোনারগ্রাম, শরিফাবাদ; মানিকপুর ইউনিয়নের বাল্লাহ, সুরানন্দপুর, হরাত্রিলোচন, মৌলভীরচক; জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়নের মাইজকান্দি, মুমিনপুর এবং সুলতানপুর ইউনিয়নের ইছাপুর কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকা। বর্তমানে স্থানীয় সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসানের প্রচেষ্টায় ডাইক মেরামতের কাজ চলছে ঠিকই, কিন্তু দুর্গত মানুষের অভিযোগÑকাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। তিন ফুট উঁচু করে টেকসই বাঁধ নির্মাণের কথা থাকলেও ঠিকাদাররা নামমাত্র কাজ করে চলেছেন।
এই খবর পেয়ে গত ১১ জুন সংসদ সদস্য নিজে বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। ভাঙনের কবলে পড়া অসহায়, সর্বস্বান্ত মানুষের দুর্ভোগের কথা তিনি শোনেন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে। বাঁধের কাজে অনিয়ম দেখে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মুফতি আবুল হাসান এমপি বলেন, নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি এক ফোঁটাও বিশ্রাম নেননি। কানাইঘাট ও জকিগঞ্জবাসীর মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এক মন্ত্রণালয় থেকে অন্য মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন। তিনি দিনরাত পরিশ্রম করে বরাদ্দ নিয়ে আসছেন, আর কর্মকর্তারা যদি কাজে অনিয়ম করেন, তবে সেটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
সবাইকে নিষ্ঠা ও সততার সাথে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তবেই এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। পরে এক সংক্ষিপ্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে সংসদ সদস্য স্থানীয়দের আশ্বস্ত করে বলেন, নদীভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জোর প্রচেষ্টা চলছে এবং জনগণের জানমাল রক্ষায় তিনি সব সময় পাশে থাকবেন। তবে জকিগঞ্জবাসীর দাবি এখন একটাইÑঅস্থায়ী কিংবা জোড়াতালির মেরামত নয়, তারা চান জন্মভিটে আঁকড়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা, একটি টেকসই ও স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.