সৌদি আরবের কাছে হারের সেই ধাক্কা যেন অনেক আগেই পেছনে ফেলে এসেছে আর্জেন্টিনা। এরপর থেকে বিশ্বকাপে একের পর এক জয়, রেকর্ড আর ইতিহাস-সব মিলিয়ে লিওনেল স্কালোনির দল এখন যেন অপ্রতিরোধ্য। সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে টানা ১২তম বিশ্বকাপ জয় তুলে নেওয়ার পাশাপাশি ষষ্ঠবারের মতো সেমিফাইনালে উঠেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। আর ইতিহাস বলছে, শেষ চারে উঠতে পারলে আর্জেন্টিনা কখনোই ফাইনালের টিকিট হাতছাড়া করেনি। সেমিফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার চোখ এখন ফাইনালে।
কানসাস সিটির কোয়ার্টার ফাইনাল অবশ্য সহজ ছিল না। ম্যাক অ্যালিস্টারের গোলে এগিয়ে থেকেও দ্বিতীয়ার্ধে ড্যান এনদয়ের গোল হজম করে সমতায় ফিরে যায় আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তি না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেই আবারও চ্যাম্পিয়নসুলভ চরিত্র দেখায় স্কালোনির দল। ১১২ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজ এগিয়ে দেন আর্জেন্টিনাকে, আর যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্তিনেজ শেষ আঘাতটি করেন।
লাউতারোর গোলটি ছিল যেন অপেক্ষার অবসান। থিয়াগো আলমাদার শট প্রথমে ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল। কিন্তু ফিরতি বলে কোনো ভুল করেননি ইন্টার মিলানের এই স্ট্রাইকার। বল জালে জড়াতেই আনন্দে গ্যালারির দিকে ছুটে যান তিনি। কয়েক সেকেন্ড পরই শেষ বাঁশি বাজে, আর শুরু হয় আর্জেন্টিনার উদ্যাপন।
জয়ের পর দলের মানসিকতা নিয়ে লাউতারো বলেন, ‘জয়ের পুনরাবৃত্তি করতে আমরা কখনোই ক্লান্ত হই না। এই দলের মধ্যে সব সময়ই আরও একটু বেশি দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে।’
সুইজারল্যান্ড ৬৭ মিনিটে সমতা ফেরানোর পরও ম্যাচে দারুণভাবে লড়াই করছিল। তবে ৭২ মিনিটে ব্রিল এমবোলো দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। একজন বেশি নিয়ে খেললেও নির্ধারিত সময়ে গোলের দেখা পায়নি আর্জেন্টিনা। কিন্তু আক্রমণের ধার কমায়নি তারা। অতিরিক্ত সময়ে সেই ধারাবাহিক চেষ্টারই পুরস্কার আসে।
এই মানসিকতার কথাই তুলে ধরেছেন লাউতারো, ‘দেখুন, প্রতিপক্ষ ১০ জনের দলে নেমে যাওয়ার পরও আমরা আক্রমণ চালিয়ে গেছি। ম্যাচে নিজেদের ধরে রেখেছি। শেষ পর্যন্ত আমরা গোলগুলো দিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছি।’
এবারের সেমিফাইনালও ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। বিশ্বকাপে এই প্রথম ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দলই জায়গা করে নিয়েছে শেষ চারে। ১৪ জুলাই ডালাসে প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে র্যাঙ্কিংয়ের এক ও তিন নম্বর দল ফ্রান্স ও স্পেন। আর ১৫ জুলাই আটলান্টায় দ্বিতীয় সেমিফাইনালে লড়বে দুই ও চার নম্বরে থাকা আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লড়াইয়ের আগে প্রতিপক্ষ নিয়ে খুব বেশি ভাবতে রাজি নন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। তার দৃষ্টি এখন নিজের দলের প্রস্তুতির দিকে। তিনি বলেন, ‘প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড হোক বা নরওয়ে, তাতে কিছু যায় আসে না। আমরা ইংল্যান্ডন্ডের মুখোমুখি হব যারা খুব ভালো ফুটবল খেলে এবং তাদের একজন দারুণ কোচ আছেন। এখন আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শক্তি ফিরে পাওয়া। সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
কোয়ার্টার ফাইনালের পারফরম্যান্স নিয়েও আত্মসমালোচনায় পিছিয়ে যাননি আর্জেন্টিনা কোচ।
সুইজারল্যান্ড ম্যাচ শেষে স্কালোনি বলেন, ‘আমাদের ভুগতে হয়েছে। জানতাম সুইজারল্যান্ড খুবই শারীরিক শক্তিনির্ভর দল। আমাদের কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছিল এবং কিছু মুহূর্তে আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। ভাগ্য আমাদের পক্ষে ছিল, কারণ তাদের একজন খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখেছিল।
জয়ের আনন্দের মাঝেও উন্নতির প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দিয়ে স্কালোনি আরও বলেন, ‘হয়তো আমরা আরও ভালো খেলতে পারতাম। কিন্তু এই দল যা অর্জন করেছে, তা ইতিহাস। আবারও বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা সত্যিই ঐতিহাসিক।’
আর্জেন্টিনার সামনে এখন আর মাত্র দুটি ম্যাচ। একটি জয় তাদের নিয়ে যাবে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে, আর আরেকটি জয় এনে দিতে পারে শিরোপা ধরে রাখার বিরল কীর্তি। টানা ১২ জয়ে উড়তে থাকা এই দলটির জন্য সত্যিই এখন যেন আকাশই একমাত্র সীমা!
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.