সিলেট নগরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করেন হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষেরা। শহরের আবর্জনা অপসারণ, নালা-ড্রেন পরিষ্কার রাখা এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিতের পেছনে রয়েছে তাদের নীরব শ্রম। অথচ বছরের পর বছর তাদের বসবাস করতে হয়েছে ঘিঞ্জি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে।
এবার সেই দুর্দশা কাটাতে উদ্যোগী হয়েছে সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক)।
সোমবার বিকেলে নগরীর কাষ্টঘর সুইপার কলোনি সরেজমিন পরিদর্শন করেন সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। এ সময় তিনি হরিজন সম্প্রদায়ের বসবাসের পরিবেশ, পানি ও বিদ্যুৎ সংকট এবং সামগ্রিক জীবনমান নিজ চোখে দেখেন এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
পরিদর্শনকালে সিসিকের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ একলিম আবদীন জানান, সিটি কর্পোরেশনের অর্থায়নে নির্মিত এই কলোনিতে বর্তমানে ৪২৪ জন হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করছেন। এদের মধ্যে ১১১ জন সিসিকে এবং ২৫ জন অন্যত্র কর্মরত থাকলেও, বাকি ১১৯ জন এখনো বেকার।
কলোনির সরু গলি, অপর্যাপ্ত আবাসন, পানির সংকট ও অনিরাপদ পরিবেশ দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সিসিক প্রশাসক। তিনি বলেন, “নগর পরিচ্ছন্ন রাখতে হরিজন সম্প্রদায়ের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাদের জীবনমান অত্যন্ত খারাপ। অতীতে তাদের উন্নয়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমরা দ্রুত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করব।”
পরিদর্শনকালে প্রশাসক দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি, চাকরিকালীন সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ এবং কর্মরত শ্রমিকদের কল্যাণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি বেকার সদস্যদের কর্মসংস্থানের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, “আমাদের দায়িত্ব যারা বেকার তাদের কাজে যুক্ত করা। আর যারা কাজ করছেন, তাদের মর্যাদা ও সুবিধা বাড়ানো। সবচেয়ে বড় কথা, তারা যেন মানুষের মতো সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।”
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কলোনিতে নিরাপদ পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে ঘিঞ্জি পরিবেশ থেকে বাসিন্দাদের পর্যায়ক্রমে উন্নত আবাসনে পুনর্বাসনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
পরিদর্শনের সময় আবেগঘন মুহূর্তেরও সৃষ্টি হয়। কলোনির বাসিন্দারা প্রশাসককে ঘিরে তাদের দীর্ঘদিনের কষ্টের কথা তুলে ধরেন। একজন বাসিন্দা বলেন, “অতীতে সিটি কর্পোরেশন থেকে কোনো মেয়র বা কর্মকর্তা আমাদের দেখতে আসেননি। আপনি নিজে এসে আমাদের কথা শুনেছেন, এটাই আমাদের জন্য বড় বিষয়।” প্রশাসকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাসিন্দারা আশা প্রকাশ করেন, এবার সত্যিই তাদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসবে।
পরিদর্শনকালে সামাজিক সচেতনতার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন সিসিক প্রশাসক। তিনি কলোনিবাসীদের মাদক গ্রহণ ও মাদক ব্যবসা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “নিজেদের ভবিষ্যৎ ও নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করতে সবাইকে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।” জবাবে বাসিন্দারা মাদকমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন।
দীর্ঘদিনের অবহেলার পর প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এমন সরাসরি উপস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। সিসিকের এই উদ্যোগ হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.