ছবি : সংগৃহীত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক শমশেরনগর বিমানবন্দর আজও চালুর অপেক্ষায়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নিয়মিত বেসামরিক ফ্লাইট বন্ধ থাকায় প্রবাসী, পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ কমছে না।
স্থানীয়দের দাবি, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু করা হলে মৌলভীবাজারসহ আশপাশের কয়েকটি জেলার যোগাযোগ, পর্যটন ও অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।
বর্তমানে বিমানবন্দরটি ‘বাংলাদেশ বিমান বাহিনী স্টেশন শমশেরনগর’ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে বিমান বাহিনীর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, রিক্রুট ট্রেনিং সেন্টার ও ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিএএফ শাহীন কলেজও।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ সরকার শমশেরনগর চা বাগানের ৬২২ একর জমি অধিগ্রহণ করে বিমানবন্দরটি নির্মাণ করে। সে সময় এটি এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সামরিক বিমানঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখান থেকে ব্রিটিশ ও মিত্রবাহিনীর যুদ্ধবিমান জাপান, চীন ও বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) ফ্রন্টে অভিযান পরিচালনা করত।
ব্রিটিশ আমলে বিমানবন্দরটি ‘দিলজান্দ বন্দর’ নামে পরিচিত ছিল। দেশভাগের পর এর নাম হয় ‘শমশেরনগর বিমানবন্দর’। পাকিস্তান আমলে ঢাকা-সিলেট রুটে পিআইএর অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট এখানে যাত্রাবিরতি করত এবং শমশেরনগর বাজারে ছিল তাদের স্থানীয় অফিস।
১৯৬৮ সালে একটি বিমান দুর্ঘটনার পর নিয়মিত ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বিমান সংকটের কারণে ১৯৭২ সালে বিমানবন্দরটি কার্যত পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। পরে ১৯৭৫ সালে এখানে বিমান বাহিনীর ইউনিট স্থাপন করা হয়। ১৯৯৫ সালে অ্যারো-বেঙ্গল নামে একটি বেসরকারি ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও পর্যাপ্ত সুবিধার অভাবে সেটি বেশিদিন টেকেনি।
বর্তমানে বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ হাজার ২০০ ফুট এবং প্রস্থ ৭৫ ফুট। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও বিমান বাহিনীর অনাপত্তি না থাকায় এটি বেসামরিক ব্যবহারের জন্য চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। রানওয়ের আশপাশের অনেক জায়গা এখন লিজ দিয়ে কৃষিকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও শমশেরনগর বিমানবন্দরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনারা এই বিমানঘাঁটিকে ঘিরেই তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছিল। বিমানবন্দর এলাকাতেই সংঘটিত হয়েছিল একাধিক সম্মুখযুদ্ধ এবং এখানকার বধ্যভূমি আজও সেই নির্মম ইতিহাসের সাক্ষী।
চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে শমশেরনগরে সীমিত পরিসরে বেসামরিক বিমানবন্দর চালুর দাবি উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবে পর্যটন ও প্রবাসীদের সুবিধার্থে বিমান বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন রানওয়ের একটি অংশ বেসামরিক ব্যবহারের উপযোগী করার আহ্বান জানানো হয়।
জবাবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী জানান, বিমানঘাঁটিটি বর্তমানে বিমান বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সেখানে সামরিক কার্যক্রম চলমান। তবে বাণিজ্যিক ব্যবহারযোগ্যতা যাচাইয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডি চলছে। সেই প্রতিবেদন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পর্যালোচনার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে স্থানীয় প্রবাসী, পর্যটন ব্যবসায়ী ও মুক্তিযোদ্ধারা দ্রুত বিমানবন্দরটি চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, মৌলভীবাজার জেলার প্রায় দুই লাখ প্রবাসী সরাসরি উপকৃত হবেন। পাশাপাশি শ্রীমঙ্গল, লাউয়াছড়া, হামহাম জলপ্রপাত, মাধবকুণ্ডসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে যাতায়াত সহজ হবে এবং এই অঞ্চলের অর্থনীতি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্যও জানিয়েছেন, বিমানবন্দরটি চালুর দাবিতে তিনি ইতোমধ্যে সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন। তাঁর আশা, সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগের মাধ্যমে একদিন আবারও চালু হবে ইতিহাসের সাক্ষী শমশেরনগর বিমানবন্দর।
সি/মা/ডেস্ক/এসসিজে
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.