প্রকাশিত: ২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৪:৪৪ (মঙ্গলবার)
লোডশেডিংয়ের অজুহাত, সেবার বাইরে বর্ধিত ওয়ার্ড

তীব্র দাবদাহ আর ভ্যাপসা গরমে পুড়ছে সিলেট নগরী। তবে রূপালী পর্দার মতো মেঘের খেলা আর বৃষ্টির আভাস থাকলেও বাস্তবে নগরবাসীর প্রতিটি ফোঁটা পানির জন্য চলছে অঘোষিত লড়াই। গত কয়েকদিন ধরে চলমান দাবদাহের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। আর এতেই ভেঙে পড়েছে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। নগরীর অলিগলিতে এখন কেবলই পানির জন্য হাহাকার আর ক্ষুব্ধ মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ। 


অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, লোডশেডিং বা কারিগরি ত্রুটিÑযা-ই বলা হোক না কেন, সংকটের গভীরতা অনেক বেশি। প্রকৃত চাহিদা নির্ধারণে ব্যর্থতা, বছরের পর বছর নতুন ওয়ার্ডগুলোতে সংযোগ না দেওয়া এবং সিসিকের উদাসীনতাই মূলত এই পরিস্থিতিকে রূপ দিয়েছে এক মানবিক সংকটে। 


সিসিকের নথিপত্র অনুযায়ী, ২০০২ সালে ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে যাত্রা শুরু করা সিলেটের বর্তমান আয়তন ৪২টি ওয়ার্ডে। পুরো নগরীর প্রায় ১০ লাখ মানুষের জন্য প্রতিদিন পানির আনুমানিক চাহিদা ১৩ কোটি লিটার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নতুন যুক্ত হওয়া ১৫টি ওয়ার্ড এবং পুরোনো ২৫, ২৬ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ড মিলে ৭ কোটি লিটার চাহিদার জায়গায় আজও এক ফোঁটা সাপ্লাই পানির সংযোগ পৌঁছায়নি। 


দীর্ঘ ৪ বছর অতিবাহিত হলেও বর্ধিত এলাকার মানুষ পুরোপুরি সিসিকের সেবার বাইরে। 


অন্যদিকে, পুরোনো ২৪টি ওয়ার্ডে দৈনিক পানির চাহিদা ৬ কোটি লিটার হলেও সিসিক সরবরাহ করতে পারে সর্বোচ্চ ৩.৫ থেকে ৪ কোটি লিটার। 


অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে সিসিকের বিশাল এক গলদ। নগরীতে বর্তমানে অনুমোদিত ৮ হাজার ২৫২টি গভীর নলকূপ এবং অসংখ্য অননুমোদিত ব্যক্তিগত টিউবওয়েল রয়েছে। এই ব্যক্তিগত গভীর নলকূপগুলো দিয়ে প্রতিদিন ঠিক কত কোটি লিটার পানি তোলা হচ্ছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান বা ডাটাবেজ সিসিকের পানি সরবরাহ শাখায় নেই। ফলে নগরের আসল পানির চাহিদা কত, তা আজও সিসিকের কাছে পুরোপুরি ‘অজানা’। 


গত কয়েকদিন ধরে নগরীর সুবিদবাজার, বড়বাজার, পাঠানটুলা, খাসদবির, উপশহর, সোনারপাড়া, কুয়ারপার, লামাপাড়া, শিবগঞ্জ, জেলরোড, বারুতখানা ও ভাতালিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সুপেয় পানির হাহাকার চলছে। যেখানে দিনে অন্তত দুইবার পানি সরবরাহ করার কথা, সেখানে গত কয়েক বছর ধরে তা নেমে এসেছে মাত্র একবারে। আর বর্তমান লোডশেডিংয়ের কারণে তাও তলানিতে ঠেকেছে। 


সোনারপাড়ার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আতিকুর রহমান ক্ষোভের সুরে বলেন, পানির নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও পাম্প চলে না। সিসিকের লাইনম্যানকে ফোন দিলে ধরে না, ধরলেও নানা অজুহাত। কয়েকদিন আগে সিসিক প্রশাসক এলাকা পরিদর্শনে এলে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা এখন সেই আশায় পথ চেয়ে আছি।”


পানি সংকটের বিষয়ে সিসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আকবর আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নগরীতে বড় ধরনের সংকটের কথা অস্বীকার করেন। তার মতে, লোডশেডিং এবং লো-ভোল্টেজের কারণে পাম্প চালাতে না পারা এবং কারিগরি ত্রুটির কারণেই সাময়িক এই বিঘ্ন। 


তিনি জানান- “নগরে সে অর্থে বড় সংকট নেই। অনেকেই নিজস্ব নলকূপ দিয়ে পানি তুলছেন। তবে বিদ্যুতের ঘন ঘন বিভ্রাটের কারণে পাম্পে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। আমাদের টিম সারাদিনই কাজ করছে। লোডশেডিং কমলেই সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।”


কর্মকর্তাদের মুখস্থ অজুহাতে শান্ত হতে পারছেন না নগরবাসী। যেখানে দিনে পাওয়ার কথা ছিল ৬ কোটি লিটার, সেখানে বিদ্যুতের অজুহাতে পানি সরবরাহ নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে। 
ভুক্তভোগী সিসিকের ৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা রুবেল জানান, ব্যক্তিগত নলকূপের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে সিসিক তাদের দায় এড়াতে চাইছে। একদিকে ভুয়া চাহিদা-পরিসংখ্যান, অন্যদিকে নতুন ১৫টি ওয়ার্ডকে পানির সেবার বাইরে ঝুলিয়ে রাখাÑসব মিলিয়ে সিসিকের সুপেয় পানি ব্যবস্থাপনা এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম। 


বিদ্যুতের আলো ফিরবে হয়তো, কিন্তু সিলেট নগরবাসীর পানির সংকট ঘোচাতে সিসিক কবে সুদূরপ্রসারী ও সঠিক পরিকল্পনা নেবে-এখন সেটাই দেখার বিষয়।