দক্ষিণ সুরমার লালমাটিয়া ডাম্পিং গ্রাউন্ডে গেলে প্রথমেই নাকে এসে লাগে তীব্র দুর্গন্ধ। খোলা আকাশের নিচে স্তূপ হয়ে থাকা বর্জ্যরে পাহাড় দিন দিন বড় হচ্ছে, আর তার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কালচে তরল মিশছে আশপাশের ধানখেত আর জলাশয়ে। অথচ প্রায় ১৬ কোটি টাকা খরচ করে এখানেই গড়ে তোলা হয়েছিল দেশের প্রথম ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি (এমআরএফ) যার প্রতিশ্রুতি ছিল বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের।
প্রায় ১০ লাখ মানুষের শহর সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) এলাকায় প্রতিদিন গড়ে উৎপন্ন হয় ৫০০ টন বর্জ্য। এই বিপুল বর্জ্যরে বোঝা সামলাতে সিসিক ও লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ২০২৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি চালু হয় আধুনিক এই বর্জ্য পৃথকীকরণ প্লান্ট। তবে বাস্তবতা উদ্বোধনের বক্তৃতার সঙ্গে মিলছে না।
কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয় গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে। এরপর থেকে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য পৃথক করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এই পৃথকীকরণের সুফল যতটা পাওয়ার কথা ছিল, তার ছিটেফোঁটাও মিলছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। প্রতিদিন প্রক্রিয়াজাত ৩০০ টন বর্জ্যরে মধ্যে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ টন প্লাস্টিক-পলিথিন পাঠানো হচ্ছে লাফার্জ সিমেন্ট কারখানায়, জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য। বাকি বিশাল অংশ প্রক্রিয়াজাত ও অপ্রক্রিয়াজাত মিলিয়ে জমা হচ্ছে ডাম্পিং স্টেশনের ভেতরেই। ফলে যে বর্জ্যরে পাহাড় কমার কথা ছিল, তা বরং প্রতিদিনই আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
পারাইরচক এলাকার বাসিন্দা আকলুস মিয়ার ভাষায়, বৃষ্টি এলেই ডাম্পিং স্টেশনের দূষিত পানি ঢুকে পড়ে তার জমিতে। ধানের চারা নষ্ট হয়ে যায়, জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে বছরের পর বছর। যেখানে একসময় ভালো ফসল হতো, সেখানে এখন উৎপাদন প্রায় বন্ধের পথে। আশপাশের খাল-বিলেও আগের মতো মাছ মেলে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পৃথকীকরণ প্রক্রিয়া থেকে নির্গত কালচে বিষাক্ত তরল বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের কৃষিজমি ও জলাশয়ে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যও।
সিসিকের প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন অবশ্য দাবি করেন, নিয়মিতভাবে তরল পানি বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। শুধু অতিবৃষ্টির সময় একবার সামান্য পানি বাইরে গিয়েছিল বলে জানান তিনি, যা পরে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে বলে দাবি তার। নিয়মিত লিকেজের কোনো তথ্য তার কাছে নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি জানান, দেড় বছর আগের এক স্টাডিতে দৈনিক বর্জ্য উৎপাদন ছিল ২০০ টন, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭৫ টনে। এর মধ্যে ৩০০ টনের বেশি বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানান তিনি। তবে কিছু বর্জ্য ভাঙারি চ্যানেলে চলে যায়, কিছু আবার ড্রেন ও ছড়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েÑ বিশেষত কলোনি ও নতুন গড়ে ওঠা এলাকাগুলোতে এই সমস্যা প্রকট।
সিসিকের তথ্য অনুযায়ী, ৫০০ টন মোট বর্জ্যরে মধ্যে ২৫০ থেকে ৩০০ টন আসে বাসাবাড়ি ও গৃহস্থালি থেকে, যা পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সংগ্রহ করে সরাসরি ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে যান। অবশিষ্ট প্রায় ১৫০ টন বর্জ্য ফেলা হয় ড্রেন, ছড়া, ভাঙারি ব্যবসায়ীর কাছে কিংবা মাটিতে পুঁতেÑ যা ঘুরেফিরে বিভিন্ন চ্যানেল হয়ে আবার পৌঁছে যায় সেই ডাম্পিং স্টেশনেই।
জনবল ও অবকাঠামো সংকটের কথাও স্বীকার করেছে সিসিক। তাদের ভাষ্য, কারিগরি সহযোগিতার আওতায় প্রতিদিনের প্লাস্টিক-পলিথিন লাফার্জে সরবরাহ করা হলেও এগুলো আলাদা করে বিট বানিয়ে বিক্রির মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও জনবল এখনো গড়ে ওঠেনি। পর্যাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিক্যাল জনবল নিয়োগেও সময় লাগবে বলে জানানো হয়েছে।
প্লান্ট সূত্রে জানা যায়, তিন শিফটে কাজ করেন শ্রমিকরা। প্রতিদিন প্রায় ৩০০ টন বর্জ্য পৃথক করার পর চারটি ট্রাকে করে (প্রতিটিতে প্রায় ১৬ টন) প্লাস্টিক-পলিথিন পাঠানো হয় লাফার্জ সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে। এই পুরো কার্যক্রম চালাতে নিয়োজিত আছেন ৯ জন ড্রাইভার, ৪ জন সুপারভাইজার এবং ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক। তেল, বিদ্যুৎ ও বেতন মিলিয়ে মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা।
ডাম্পিং স্টেশন স্থানান্তরের দাবি নতুন নয়। ২০২২ সালেই সিলেট-৩ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব এই বিষয়ে তৎকালীন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে চিঠি দিয়েছিলেন। তবে চার বছর পরও পরিস্থিতির বিশেষ পরিবর্তন হয়নি।
সিসিক কর্মকর্তা একলিম আবদীন বলছেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা বায়োমাইনিংয়ের মতো প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, তবে এতে প্রয়োজন বড় বিনিয়োগ ও দীর্ঘ সময়। লাফার্জের প্রতিদিনের ৫০ টন প্লাস্টিক সরিয়ে নেওয়াকে তিনি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবেই দেখছেন, যদিও তা সামগ্রিক সমস্যার তুলনায় সামান্যই।
আধুনিক প্রযুক্তি বসিয়ে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল সিসিক ও লাফার্জ হোলসিম, দেড় বছর পর তার বাস্তবায়ন এখনো অনেকটাই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। যতক্ষণ না অবকাঠামো, জনবল আর বিনিয়োগের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে, ততক্ষণ পারাইরচকের মতো এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গী হয়ে থাকবে দুর্গন্ধ, দূষিত পানি আর ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকা বর্জ্যরে পাহাড়।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.