কাগজে সচল, বাস্তবে ‘নিখোঁজ’
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ ১৪:৫২
বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙবে, মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেট ভারী হওয়া বন্ধ হবে, আর কৃষক ও ভোক্তা সরাসরি মুখোমুখি হবেনÑএমন এক বুক আশা নিয়ে সিলেটে চালু হয়েছিল ‘কৃষকের হাট’। স্বপ্ন ছিল, কোনো ফড়িয়া বা দালালের স্পর্শ ছাড়াই গ্রামীণ কৃষক তাঁর রক্ত জল করা ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবেন, আর সাধারণ মানুষ পাবেন কম দামে বিষমুক্ত টাটকা সবজি।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, জমকালো আয়োজনে ফিতা কাটার পর মাত্র একদিনই দেখা মিলেছিল এই হাটের, এরপর থেকে সেটি যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে। বাস্তবে হাটের কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও কর্তৃপক্ষের দাবিÑহাট নাকি ‘কাগজে-কলমে’ পুরোদমে সচল রয়েছে।
গত ১১ এপ্রিল সিলেটের টিলাগড় পয়েন্টে প্রথমবারের মতো এই ব্যতিক্রমী হাটের উদ্বোধন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
উদ্বোধনের সময় কৃষি বিভাগ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল হাটটি প্রতিদিন বসবে, তবে পরে সিদ্ধান্ত বদলে বলা হয় সপ্তাহে শনি ও মঙ্গলবার বসবে হাট। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, উদ্বোধনের পরদিন কেবল একবারের জন্যই বসেছিল এই হাট, এরপর আর কোনো দিন সেখানে কোনো কৃষকের পা পড়েনি, বসেনি কোনো সবজির পসরাও।
উদ্যোগটি এভাবে থমকে যাওয়ার পেছনে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের চরম সমন্বয়হীনতা এবং একে অপরের ওপর দায় চাপানোর সংস্কৃতিকেই দায়ী করছেন সচেতন মহল।
তবে সিলেট সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শওকত জামিলের দাবি অন্যরকম। হাট বন্ধ হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, হাটটি বন্ধ হয়নি, কাগজে-কলমে চালু রয়েছে। বর্তমানে বর্ষা মৌসুম চলায় স্থানীয়ভাবে সবজি উৎপাদন কিছুটা কম হওয়ায় কৃষকরা হাটে আসছেন না, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কৃষকরা আবার যোগাযোগ করবেন এবং হাট পুরোদমে চালু হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. শামসুজ্জামানও একই সুরে বলেন, বর্ষার কারণে সবজি উৎপাদন কম হওয়ায় হয়তো কৃষকরা আসছেন না।
তবে কর্তৃপক্ষের এই ‘বর্ষা তত্ত্ব’কে স্রেফ খোঁড়া অজুহাত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, বর্ষার মধ্যেও সিলেটের অন্যান্য গ্রামীণ বাজারগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ স্থানীয় কৃষিপণ্য ও সবজি উঠছে, তাহলে শুধু ‘কৃষকের হাটে’ আসার সময়ই কৃষকদের সবজি ফুরিয়ে যায় কীভাবে?
আশার আলো দেখে যারা হাটে এসেছিলেন, এখন তারা ক্ষোভে ও হতাশায় ফুঁসছেন।
স্থানীয় মিরাবাজাট এলাকার বাসিন্দা আনিসুল হক তাঁর হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, কৃষকের হাট উদ্যোগটি অনেক ভালো ছিল। আমরা ভেবেছিলাম সরাসরি কৃষকের হাত থেকে পণ্য কিনতে পারব, এখন মনে হচ্ছে এসবই ছিল আইওয়াশ। দু-একদিন হাটে গিয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছি। একই সুর দাসপাড়া এলাকার বাসিন্দা আনোয়ারুল ইসলামের কণ্ঠেও, তিনি জানান, বলা হয়েছিল শনি ও মঙ্গলবার হাট বসবে, কিন্তু গিয়ে শেডের দিকে তাকিয়ে দেখি শূন্য মাঠ, কেউ কোথাও নেই। একটি জনহিতকর উদ্যোগ এভাবে শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ায় তীব্র হতাশা প্রকাশ করে সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি
খন্দকার সিপার আহমদ বলেন, কৃষকের হাটের মতো একটি চমৎকার উদ্যোগ শুরু না হতেই থমকে যাওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। কৃষি বিভাগের দায়িত্ব ছিল কৃষকদের নিয়মিত যাতায়াত ও পণ্য আনার বিষয়টি তদারকি ও নিশ্চিত করা। বর্ষার অজুহাত না দিয়ে দ্রুত এটি পুনরায় কার্যকরভাবে চালু করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
এখন সিলেটের সাধারণ মানুষের প্রশ্নÑযে হাট কেবল ফাইলের পাতায় কিংবা কাগজে-কলমে বেঁচে থাকে, তা দিয়ে সাধারণ ক্রেতা কিংবা প্রান্তিক কৃষকের কী লাভ? ‘আইওয়াশ’ কিংবা সাময়িক প্রচারণার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে প্রশাসন কি পারবে সিন্ডিকেটমুক্ত এই হাটটিকে বাস্তবে সাধারণ মানুষের দোড়গোড়ায় ফিরিয়ে দিতে? সিলেটবাসী এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়।
বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন