#সিলেট-১ আসনে দ্বিমুখী লড়াই
# ৮ বছরে বেড়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ভোটার,
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মর্যাদাপূর্ণ সিলেট-১ (সিলেট সিটি কর্পোরেশন ও সদর উপজেলা) আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ দিন দিন বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই আসনটি নানা কারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে তরুণ ভোটারদের বিস্ময়কর উত্থান।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে এই আসনে নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার তরুণ ভোটারÑ যা মোট ভোটারের ২০ শতাংশ। এবারের নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে যে দ্বিমুখী লড়াই চলছে, তার চূড়ান্ত ব্যবধান গড়ে দেবে এই তরুণ ভোটাররাই। এই দুই শক্তির মুখোমুখি অবস্থানে তরুণ ভোটাররা হয়ে উঠেছেন ‘সুইং ফ্যাক্টর’।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য সূত্রে জানা গেছে, সিলেট-১ আসনে বর্তমানে মোট ভোটারের সংখ্যা ৬ লাখ ৮০ হাজার ৯৪৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার রয়েছেন ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৮৬ জন, নারী ভোটার ৩ লাখ ২৭ হাজার ৭৪৭ জন এবং হিজড়া ভোটার ১৩ জন।
গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে ভোটার সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৩৪ হাজার ২১ জন। আর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার ২১৯ ভোটার। এ অনুয়ায়ী বিগত ৮ বছরে তরুণ ভোটার বেড়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৭২৭ জন। এরমধ্যে স্থানান্তরিত ভোটার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার এবং অনুমোদিত পোস্টাল ভোটার সংখ্যা ১২ হাজার ৪৩৯ জন।
এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যার মধ্যে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী ভোটারদের সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। আট বছর আগে যে ভোটার তালিকা ছিল, সেখানে এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল না। ফলে রাজনৈতিক সমীকরণও ছিল ভিন্ন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে শিক্ষা, প্রযুক্তি, প্রবাসী সংযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কারণে এই তরুণ ভোটাররা এখন শুধু সংখ্যায় বড় নয়, চিন্তাভাবনায়ও ভিন্ন ভিন্ন। আগের নির্বাচনে যেখানে পরিবার বা এলাকার প্রভাব ভোটের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখত, সেখানে এবারের তরুণ ভোটাররা প্রার্থী, আদর্শ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে প্রচলিত ভোটব্যাংকের রাজনীতির বাইরে গিয়ে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
সিলেট আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেট-১ আসনে ভোটের মাঠে রয়েছেন ৮ প্রার্থী। তারা হলেন- খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর (বিএনপি) ধানের শীষ, মাওলানা হাবিবুর রহমান (জামায়াতে ইসলামী) দাঁড়িপাল্লা, সঞ্জয় কান্ত দাস (বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-মার্কসবাদী) কাঁচি, মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন সুমন (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি) কাস্তে, আকমল হোসেন (গণঅধিকার পরিষদ) ট্রাক, মো. শামীম মিয়া (ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ) আপেল, মাহমুদুল হাসান (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) হাতপাখা, প্রণব জ্যোতি পাল (বাসদ) মই। ভোটের মাঠে ৮ প্রার্থী সক্রিয় থাকলেও ভোটের হিসাব-নিকাশে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সিলেট-১ আসনে এবারের নির্বাচন মূলত ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে দ্বিমুখী লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। নির্বাচনী মাঠে ৮ প্রার্থী থাকলেও ভোটের হিসাব-নিকাশে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই দুই প্রতীকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা।
নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে প্রচার-প্রচারণা জোরদার করেছেন সব প্রার্থীই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভোটার এলাকায় গণসংযোগ, সভা-মিছিল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছেন তারা।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ অন্য দলগুলোর প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয় থাকলেও ভোটের হিসাব-নিকাশে প্রধান লড়াই বিএনপি-জামায়াত এই দুই দলের মধ্যেই থাকবে বলে মনে করছেন ভোটাররা।
সিলেটের তরুণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের প্রধান ভাবনার জায়গাগুলো হলো, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হবার সুযোগ, শিক্ষা ও আধুনিক প্রশিক্ষণ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা।
তরুণ ভোটার বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে নির্বাচনী প্রচারণার ধরনেও। সিলেট-১ আসনে এবার ব্যানার-ফেস্টুনের পাশাপাশি ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রচারণা চোখে পড়ার মতো। প্রার্থীরা লাইভে এসে বক্তব্য দিচ্ছেন, তরুণদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন, উন্নয়ন ও রাষ্ট্রচিন্তা তুলে ধরছেন ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে। যদি তরুণ ভোটারদের বড় অংশ কেন্দ্রে আসে, তাহলে ফলাফলে বড় ধরনের চমক দেখা যেতে পারে। আবার ভোটার উপস্থিতি কম হলে প্রচলিত ভোটব্যাংকই সুবিধা পাবে।
বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফাহিম হাসান সিলেটের মানচিত্রকে বলেন, ‘শুধু স্লোগান বা আবেগ নয়, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্বই তাদের ভোটের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে। ফলে যেসব প্রার্থী তরুণদের ভাষায় কথা বলতে পারছেন, তাদের দিকেই ঝুঁকছে নতুন ভোটারদের একটি বড় অংশ।’
১০ দলীয় জোটপ্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা হাবিবুর রহমান সিলেটের মানচিত্রকে বলেন, ‘আমরা প্রতিজন ভোটারকেই সম্মানের সাথে গুরুত্ব দিচ্ছি। যেহেতু তরুণরা দেশকে বদলে দিয়েছে। তাদের রক্তে ভেজা আজকের বাংলাদেশ। তাই তাদেরকে সাথে নিয়েই আগামীর বাংলাদেশ গড়া হবে।’
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেটের মানচিত্রকে বলেন, ‘সিলেটে বিপুল সংখ্যক তরুণ, যুবক রয়েছে, যাদের উদ্যম আছে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কিছু করার চিন্তা আছে। কিন্তু সীমিত সুযোগ, গাইডলাইনের অভাব ও পরিকল্পনাহীনতায় এই উদ্যম কাজে লাগছে নাÑ যারা সুযোগ পেলে দেশকে বদলে দিতে পারে। আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সিলেটে তরুণদের কাজে লাগাতে তথ্যপ্রযুক্তিসহ সকল খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করব। প্রযুক্তি খাতে যাতে লাখো তরুণের কর্মসংস্থান হয়, সেই পরিকল্পনাও আমাদের আছে।
বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন