বিশেষ প্রতিবেদন

বিদ্রোহীর চাপে ফারুক, বেকায়দায় রাজু

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৫:২৩

সিলেট অঞ্চলের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ আসন— সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) এবং সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) এবার নির্বাচনী মাঠে জোটের শরিকদের অসহযোগিতা ও বিদ্রোহী প্রার্থীর চাপ বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, দুজনই জোটের মনোনীত প্রার্থী হলেও মাঠে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

নির্বাচনী মাঠের সূত্র বলছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের (মামুনুল) প্রার্থী মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু জামায়াতের তৃণমূলের কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না। কারণ, এ আসনে শুরু থেকে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ। তিনি ওই আসনের মানুষের কাছে আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। এমনকি নির্বাচন উপলক্ষ্যে মাঠে ও সামাজিক মাধ্যমে তিনি ফেসবুক রিলের প্রচারে এগিয়ে ছিলেন। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবেও অন্তত দক্ষিণ সুরমায় তার নিজস্ব একটি ভোট ব্যাংক ছিল। এছাড়াও ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জেও তার মোটামুটি পরিচিতি ছিল। অনেকেই নিশ্চিত ছিলেন এ আসনে বিএনপির প্রার্থী এম এ মালিকের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে থাকবেন মাওলানা লোকমান। কিন্তু দলের সিদ্ধান্তে জোটের শরিক দলের প্রার্থী রাজুকে আসনটি ছেড়ে দেয় জামায়াত। সেদিন থেকেই এ আসনে জামায়াত মাওলানা রাজুকে কোনো সহযোগিতা করছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সূত্র আরও জানায়, সিলেট-৫ আসনে শুরু থেকেই বিএনপির প্রার্থী ছিলেন চাকসু মামুন। কিন্তু জোটের শরিক জমিয়তের মাওলানা উবাদুল্লাহ ফারুককে আসনটি ছেড়ে দেয় বিএনপি। ফারুক বিএনপির জোটের প্রার্থী হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি গোটা বিএনপির সমর্থন পাননি। এ আসনটিতে ভোটের ফলাফল নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছেন জোটের শরিক প্রার্থী মাওলানা ফারুক। কারণ, তার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী চাকসু মামুন। যিনি শুরু থেকেই তৃণমূল বিএনপিকে দখলে রেখেছেন। মাওলানা ফারুক বিএনপির হাতেগোনা নেতা নিয়ে জোটের প্রচারণা চালালেও কানাইঘাট-জকিগঞ্জের প্রান্তিক বিএনপির কর্মীদের কাছে টানতে পারেননি। তবে তিনি সিলেট জেলা বিএনপির নেতাদের নিয়ে সভা করে তৃণমূল বিএনপিকে কাছে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এখনও চাকসু মামুনের সঙ্গ ছাড়েননি বিএনপি নেতারা। তাদেরকে বহিষ্কারের হুমকি দিয়েও ঠেকাতে পারছে না জেলা বিএনপি।

জামায়াতের একটি সূত্রে জানা গেছে, সিলেট-৩ আসনে (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) জামায়াত আশা করেছিল মাওলানা লোকমান প্রার্থী হবেন। কারণ, ওই আসনে মনোনয়ন নিয়ে বিএনপির বিভক্তি ছিল তুঙ্গে। সালাম-কাইয়ুম বলয়ের অসহযোগিতা বিএনপির প্রার্থী মালিককে বেকায়দায় ফেলতে পারত। সুযোগটি কাজে লাগাতে চেয়েছিল জামায়াত। দলটির সূত্র বলছে, সিলেটে একমাত্র দক্ষিণ সুরমার মাওলানা লোকমানই নির্বাচনে আসনটি ধরে রাখার মত একজন প্রার্থী ছিলেন। কেননা, তিনি এর আগে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু দল রাজুকে মনোনয়ন দেওয়ায় হতাশায় ডুবেছে জামায়াত। আসনটিতে ভোটের আগ্রহ হারিয়েছে জামায়াতের কর্মীরা। তাই তাদেরকে জোটের শরিক প্রার্থী মাওলানা রাজুকে সহযোগিতা করতে দেখা যাচ্ছে না। তা ছাড়াও রাজুকে সহযোগিতা না করার অন্যতম কারণ আকিদাগত সমস্যা।
রাজু সিলেটের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা নুরুল হক গহরপুরীর ছেলে। গহরপুরী কওমী ঘরানার একজন প্রখ্যাত আলেম ছিলেন। একটি সূত্র জানিয়েছে জামায়াতের কর্মীরা চায় না ওই আসনে কওমীর শক্তি বৃদ্ধি পাক।

জামায়াতের অন্য একটি সূত্র বলছে, সিলেট-৫ আসনে (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) জামায়াতের আসন পুনরুদ্ধার করার মত একজন প্রার্থী ছিলেন মাওলানা আনওয়ার হোসাইন খান। কিন্তু জোটের শরিকদের আসনটি ছেড়ে দিতে হয়েছে। সেখানে মাওলানা আবুল হাসানকেও খুব একটা সহযোগিতা করছে না স্থানীয় জামায়াত। এ কারণে, ওই আসন পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দিন দিন ফিকে হয়ে আসছে। আসনটিতে মাওলানা ফরিদ উদ্দিনের পর মাওলানা আনওয়ারই ছিলেন জামায়াতের আস্থার জায়গা। আবুল হাসানের চেয়ে বিএনপির জোটের প্রার্থী মাওলানা উবাদুল্লাহ ফারুকের উপর ভরসা বেশি করছে প্রান্তিক জামায়াত। তবে এ আসনে জামায়াত আবুল হাসানকে সহযোগিতা করলে মাওলানা ফারুকের ভোট কমতে পারে। তখন ফারুক-আবুলের লড়াই দুই আলেমের ভোট কমিয়ে দিতে পার এমনটাই মনে করছেন অনেকে। ফলে মাঝখান থেকে বিএনপির বিদ্রোহী মামুন নিজস্ব ভোট ব্যাংক নিয়ে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিএনপির একটি সূত্র জানায়, সিলেট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী এম এ মালিক বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, ওই আসনে তিনি আগে থেকেই একজন জাতীয় ও লন্ডনভিত্তিক নেতা হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছেন। মালিকের প্রচার করতে গাজীপুরের মানুষও দক্ষিণ সুরমায় এসেছেন। এছাড়া লন্ডনের বিপুল সংখ্যক প্রবাসী নেতা মালিকের বিজয় দেখতে দেশে অবস্থান করছেন। লন্ডনে মালিকের রেস্টুরেন্ট ব্যবসা থাকায় তাকে নিয়ে দুর্নীতির কোনো শঙ্কা দেখছে না স্থানীয় ভোটাররা। এমনকি জীবনের শেষ বয়সে এসে এমএ মালিক দলের জন্য কাজ করবেন, নিজের জন্য নয় এমনটিই ভাবছেন এখানকার ভোটাররা।

জানতে চাইলে সিলেট জেলা কৃষকদলের নেতা ও লালাবাজার ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি মো. নানু মিয়া বলেন, ‘মালিক ভাইকে শুধু দক্ষিণ সুরমার নেতা নন, তিনি বিএনপির জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নেতা। তাকে গোটা দেশের মানুষ চেনে। তিনি তারেক রহমানের ঘনিষ্টজন। তিনি এমপি হলে আমাদের এলাকার উন্নয়ন সহজ হবে। তিনি জীবনভর বিএনপি করেছেন, এখন শেষ বয়সে এসে তার নিজের জন্য কোনো চাওয়া পাওয়া নেই, কারণ মালিক ভাইকে আল্লাহ অনেক দিয়েছে। তিনি এখন আমাদের এলাকার উন্নয়ন করতে চান, শেষ বয়সে একবার এমপি হতে চান।’

বিএনপির সূত্র আরও জানায়, জামায়াতের লোকমান না থাকা ও আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় একতরফা বিজয় হতে পারে যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতা মালিকের। কেননা, আশঙ্কা করা হচ্ছে রাজুকে ঠেকাতে জামায়াত ওই আসনে ভোটে নাও যেতে পারে। এ অবস্থায় জামায়াতের এ অসহযোগিতায় ফলাফল বিপর্যয়ে পড়তে পারেন শরিক জোটের প্রার্থী রাজু। এ অবস্থায় মালিক দলের কোন্দল মিটিয়ে ভোটেই বাজিমাত করতে পারেন।

সিলেট-৫ আসনে বিএনপি মনোনীত জোটের প্রার্থী মাওলানা উবাদুল্লাহ ফারুক বলেন, ‘এটা তো আমার ঘর। আমি ইনশাআল্লাহ, জকিগঞ্জ আর কানাইঘাটরে ২০ বৎসরের সুন্দরী মেয়ে যেভাবে সুন্দর, এইভাবে সাজাইয়া সুন্দর অবকাঠামোর ওপরে দুইটা উপজেলারে হাজাইয়া দিতাম পারমু।’

সিলেট-৫ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী মামুনুর রশীদ বলেন,‘ আমার ৪৬ বছরের রাজনৈতিক জীবনে এবং গত ১৭ বছরের জেল-জুলুমের মধ্যেও আমি কখনো এই এলাকার মানুষকে ছেড়ে যাইনি। কোনো সময় সরাসরি উপস্থিত থাকতে না পারলেও আমার নেতাকর্মীদের মাধ্যমে সবসময় মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আজ আমি সবকিছু ছেড়ে আপনাদের কাছেই এসেছি।’

সিলেট-৩ আসনের জামায়াতের জোটের প্রার্থী মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে একজন মুরুব্বি মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন। ১২ তারিখের নির্বাচনে ইনশাআল্লাহ আমাকে নির্বাচিত করে সংসদে পাঠাবেন। গোটা বাংলাদেশের মানুষ চাঁদাবাজদের পরিষ্কার ম্যাসেজ দিতে চাই ‘টাইম ইজ ওভার’।

সিলেট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী এম এ মালিক বলেন, ‘আপনারা যদি আমাকে ভোট দিয়ে পার্লামেন্টে পাঠান, আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমি আপনাদের দাবিদাওয়া বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’
তিনি আরও বলেন, রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্যসেবা, হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা ও অন্যান্য স্থানীয় সমস্যা সমাধানে আমি আন্তরিকভাবে কাজ করতে চাই। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশেই আমি দেশের মানুষের সেবা করার জন্য প্রবাসের জীবন ছেড়ে দেশে ফিরে এসেছি।’

বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন