বিশেষ প্রতিবেদন

চুলা জ্বালাতে গিয়ে থমকে যাচ্ছেন গৃহিণীরা

সিলেটে কাগজে-কলমে সুরক্ষিত এলপিজির দাম

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:২১

ভোরবেলা রান্নাঘরে হাঁড়ি চাপানোর আগে গৃহিণী শারমিন তামান্নার চোখ চলে যায় খালি সিলিন্ডারের দিকে। বাজারে গেলে দোকানদাররা বলে 'গ্যাস নাই।' কোথাও আবার পাওয়া যায়, তবে সরকারি দামের চেয়ে অনেক বেশি। রান্নাঘরের চুলা জ্বালাতে গিয়ে বার বার থমকে যাচ্ছেন গৃহিণীরা। সিলিন্ডার শেষ। নতুন কিনতে হবে। তিন দোকান ঘুরে খালি হাতে ফিরে আসার পর মিলছে একটি সিলিন্ডার। কিন্তু দাম শুনে বুকটা ধক করে উঠে তাদের। শুধু তামান্না নয় সিলেটের শত শত গৃহিণীর একই অবস্থা। চুলোয় হাঁড়ি চাপানোর আগে হাজার চিন্তা মাথায় নিয়ে তাদেরকে রান্না


করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারে রান্নার খরচ বেড়ে গেছে। বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানি ও সরকারের মধ্যে সমঝোতা হলে বাজার স্থিতিশীল হবে। অন্যদিকে ক্রেতারা চান, সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস বিক্রি নিশ্চিত করতে প্রশাসন যেন আরও কঠোর হয়। গেল ১ এপ্রিল সরকার তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার দাম নির্ধারণ করে ১৭'শ ২৮ টাকা। কাগজে-কলমে এই দাম সুরক্ষিত।

 

কিন্তু সিলেট নগরী ও আশপাশের বাজারে একই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে এক ২২'শ থেকে আড়াই হাজার টাকায়। তা-ও কোন দোকানে মিলছে আবার দোকানে মিলছে না। এছাড়া ৩৫ কেজির বড় সিলিন্ডার উঠে গেছে ৫ হাজার তিনশো টাকায়।


রবিবার সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সবখানেই বেশী দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার। আবার কেউ কেউ সিলিন্ডার নেই বলেও ক্রেতাকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। ১৭'শ ২৮ টাকা দামের সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২২'শ থেকে আড়াই হাজার টাকায়। বন্দরবাজারের বেশ কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখা গেল ওই ব্যবসায়ীরা অনেকটা কৌশলী। তারা প্যাকেজে বিক্রি করেন এলপিজি সিলিন্ডার।


কেউ নতুন চুলা কিনলে তাদের কাছে গ্যাস বিক্রি করেন। তবে আশপাশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্যাসের দাম বাড়ায় এটি তাদের কৌশল। আসলে তারা ক্রেতাদের কাছে বেশী দামে বিক্রি করার জন্য এমনটি করছেন।


পূর্ব বন্দরবাজারে মর্ডান চুলা ঘরের এক দোকানী বলেন, আমরা চুলা সহ গ্যাসের বোতল বিক্রি করি, গ্যাস বিক্রি করি না। পাশের আরও কয়েকটি দোকান বিসমিল্লাহ চুলা ঘর, খান চুলা ঘর, অনুপম চুলা ঘর, আহসান চুলা ঘর, শাওন গ্যাস বার্নার ও ইকবাল চুলা ঘরের দোকানীরা জানালেন তারা চুলা সহ গ্যাস বিক্রি করেন। তবে সিলিন্ডার বিক্রি করেন না।


গ্যাস বিক্রি করেন না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, ডিলাররা বাড়তি দাম রাখেন। আর বেশি দামে গ্যাসের বোতল এনে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করতে গেলে অনেক কথা শুনতে হয়, মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমান আদালত নজরদারি করতে আসে এজন্য আমরা সিলিন্ডার বিক্রি করি না।


নগরীর টিলাগড় বোরহানবাগ এলাকার রুদ্র চুলা ঘরের মালিক রজত রায় জানান, তারা ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন। আর বাসায় ডেলিভারি ২১০০।


মেসার্স সেবা এন্টারপ্রাইজের রাহেল আহমদ চৌধুরী, শিবগঞ্জ পয়েন্টের মীম এন্টারপ্রাইজের মো. রোমান আহমেদ জানান তারা ২১ টাকার মধ্যেই বিক্রি করছেন বলেও জানান। তবে তাদের কাছে সিলিন্ডার থাকা সাপেক্ষে এই দামে বিক্রি করছেন। অন্য একটি সূত্রে জানা গেছে, তারা বেশী দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। দামে দরে পোষালে সিলিন্ডার বিক্রি করেন। নতুবা সিলিন্ডার নেই বলে গ্রাহককে ফিরিয়ে দেন।


ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈশ্বিক সংকটের কারণে এলপিজির দাম বেড়েছে। ফলে চাহিদার তুলনায় যোগান কমেছে। এতে করে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সিলিন্ডার দিতে পারছেন না তারা। সরকারি দামের চেয়ে বেশি দরে যেখানে কোম্পানি থেকে কিনতে হয়, সেক্ষেত্রে ভোক্তাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয় তাদের। তাই সরকারের সাথে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের এ ব্যাপারে একটি সমঝোতার দাবি ব্যবসায়ীদের।


এ ব্যপারে সিলেট এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটর এসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকার যে দাম দিয়ে বিক্রি করতে বলেছে সেটা আমরা পারছি না। কারণ হিসাবে তিনি বলেন, কোম্পানি তার কাছ থেকে নিচ্ছে ১৮'শ ৪০ টাকা। এখন কিভাবে তিনি ওই দামে সেটি বিক্রি করবেন। তিনি বলেন বিষয়টি নিয়ে আমরা জেলা প্রশাসকের কাছে একটি আবেদন দিয়েছি। আমরা তাকে বলেছি


ব্যবসা এভাবে করতে পারব না। তিনি বলেছেন বিষয়টি দেখছেন। এছাড়া চড়া দাম সরবরাহ কম, চাহিদা বেশি বলেও জানান ওই ব্যবসায়ী।


তিনি বলেন, এনিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিদিন বচসা হচ্ছে। এদিকে এই টানাপোড়েনের মাঝে হোটেল ব্যবসায়ীরা খাবারের দাম বাড়ানোর পায়তারা শুরু করেছেন।


দক্ষিণ সুরমার বাসিন্দা মোর্শেদ আহমদ জানান, কিছুদিন আগেও ১ হাজার ৬৫০ টাকায় সিলিন্ডার কিনতেন। এখন সেই দাম লাফিয়ে ১৯'শ টাকায় ঠেকেছে। মাসের শেষে হিসেব মেলাতে বসলে অঙ্কটা আর ছোট থাকে না।


টিলাগড় এলাকার বাসিন্দা তোফা মারিয়াম বলেন, তিনি একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিন দোকান ঘুরে পেয়েছেন একটি সিলিন্ডার। আর সেটি কিনতে হয়েছে ২৫'শ টাকা দিয়ে। অথচ সরকার সিলিন্ডারের দাম বেঁধে দিয়েছে ১৭'শ ২৮ টাকা।
এদিকে অনেক পরিবার এখন লাইনের গ্যাসওয়ালা বাসা খুঁজছেন। এলপিজির এই অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির পথ হিসেবে বাড়িবদলের চিন্তাও করছেন কেউ কেউ। এ যেন এক সংকট থেকে আরেক সংকটে দৌড়ানো।


এদিকে গত এক সপ্তাহে সিলেট জেলায় চারটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে। দক্ষিণ সুরমার একটি গ্যাস ডিপো একাই গুনেছে ৪০ হাজার টাকা। জৈন্তাপুরে দুই ডিস্ট্রিবিউটর গুনেছেন ৬ হাজার।


অভিযান পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা বলছেন, অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের প্রমাণ মিলেছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, অভিযান চলবে নিয়মিত।


সিলেট নগরী ও আশপাশের এলাকায় এলপিজি গ্যাসের বাজারে চলছে তীব্র অস্থিরতা। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে, আর এতে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে হোটেল ব্যবসায়ী সবাই পড়েছেন বিপাকে।


গোলাপগঞ্জ: গোলাপগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিলেটের গোলাপগঞ্জের এলপিজি প্লান্ট থাকা সত্ত্বেও গোলাপগঞ্জের মানুষ সরকারি মূল্যে গ্যাস সিলিন্ডার না পাওয়ার প্রতিবাদে ও পুণরায় তা চালুর দাবিতে মানববন্ধন করেছেন।


বুধবার সকাল ১০টায় গোলাপগঞ্জের সর্বস্তরের জনসাধারণের ব্যানারে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন বক্তারা বলেন, আমাদের এলাকা থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে কিন্তু আমরা অনেকেই গ্যাস সংযোগ পাওয়া থেকেও বঞ্চিত রয়েছি। বিগত দিন আমরা কার্ডের মাধ্যমে গোলাপগঞ্জ এলপিজি গ্যাস প্লান্ট থেকে সরকারি মূল্যে ৬৫০ টাকা করে গ্যাসের সিলিন্ডার পেতাম। এখন এলপিজি গ্যাস প্লান্টে আমাদের সিলিন্ডার দেওয়া বন্ধ রয়েছে।


বক্তারা আরো বলেন, এই গ্যাস প্লান্ট থেকে প্রতিদিন বেশ কয়েকটি গাড়িতে করে সিলিন্ডার যায়, কিন্তু গোলাপগঞ্জের মানুষ তা পায়না। কোন অজানা ডিলারের কাছে এগুলো যায় তাও কারো অবগত নয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে এই সিলিন্ডারগুলো বিক্রি করা হলে এলাকাবাসী উপকৃত হতো। এজন্য স্থানীয়ভাবে ডিলার নিয়োগ করার আহবানও জানান বক্তারা। তারা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই সমস্যাগুলো গুলো সমাধান ও এলপিজি প্লান্ট থেকের আগের মত সূলভ মূল্যে সিলিন্ডার দেওয়া না হলে আগামীতে কঠোর কর্মসূচী দেওয়ার হুশিয়ারিও প্রদান করেন।


মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন সালমান আহমদ, সাবি-না বেগম, রুনা বেগম, স্বপন আহমদ, হৃদয় আহমদ প্রমুখ।

বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন


 শিরোনাম
news icon সিলেটে আধুনিক সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে: বর্ষবরণ উৎসবে শ্রমমন্ত্রী news icon বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক news icon প্রকল্পের কাজের মানে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে: শ্রম মন্ত্রী news icon ৯ খাতে ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত সরকারের news icon সারাদেশে র‍্যাবের কড়া নিরাপত্তা, মাঠে স্পেশাল কমান্ডো ফোর্স news icon সিলেটে উচ্ছেদ হচ্ছে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা-ইজি বাইক শোরুম news icon কৃষকের মরণপণ চেষ্টায় রক্ষা পেল হাওরের ধান news icon ছয় কারণে ব্যর্থ হল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা news icon সিলেটে অপরাধ রুখতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীর আল্টিমেটাম news icon সশস্ত্র বাহিনী ঐক্যবদ্ধ থাকলে বাংলাদেশকে কেউ কখনো হারাতে পারবে না