#হোটেল-মোটেল পরিপূর্ণ,
# জাফলং-বিছনাকান্দি-সাদাপাথরে উপচেপড়া ভিড়
সকালবেলা সিলেট নগরীর রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বোঝা যাচ্ছিল ঈদের ছুটি শেষ হলেও ভ্রমণকারীদের পদচারণা থামেনি। বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে হোটেল-রিসোর্ট পর্যন্ত সর্বত্রই দেখা মিলছে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আসা পর্যটকদের। নগরীর কোলাহল পেরিয়ে তারা ছুটছেন প্রকৃতির টানে, পাহাড়-নদী-চা-বাগানের মায়াবী সৌন্দর্যে।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দলবেঁধে মানুষ ছুটে আসছেন প্রকৃতির টানে। কেউ নদীর স্বচ্ছ জলে পাথর ছুঁয়ে দেখছেন, কেউ পাহাড়ি ঝরনার ধারা গায়ে মেখে নিচ্ছেন প্রকৃতির স্পর্শ। প্রকৃতির সৌন্দর্য, মানুষের উচ্ছ্বাস আর স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্য মিলিয়ে সিলেট এখন দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র।
ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি মঙ্গলবার শেষ হলেও সিলেটে পর্যটকদের আসার স্রোত এতটুকু থামেনি।
ছুটির পরদিন থেকেই জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে দেখা গেছে ভ্রমণপিপাসুদের উচ্ছ্বসিত উপস্থিতি। হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলো ছিল পুরোপুরি পরিপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় স্পটগুলোতে ছিল পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার, হযরত শাহপরান (রহ.) মাজার, অন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম, লাক্কাতুড়া চা-বাগান, বাইশটিলা, খাদিম রিসোর্ট, জাফলং, সাদা পাথর, বিছানাকান্দি, উৎমাছড়া, দমদমছড়া, লক্ষণছড়া, পান্থুমাই, তামাবিল, নলিউরি ফলস, ডিবির হাওর, জৈন্তাপুর, লালাখাল, জলার বন রাতারগুল এবং খাসিয়া পানপুঞ্জিসহ অর্ধশতাধিক পর্যটন স্পটে ছিল দর্শনার্থীদের অবিরাম আনাগোনা।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদের ছুটি শেষ হলেও পর্যটকের এই চাপ আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে, কেননা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখনও পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রকৃতির টানে সিলেটে আসছেন। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর এলাকায় এবার জমে উঠেছে বিশেষ পর্যটন কার্যক্রম। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা আর ধলাই নদীর বুকে ছড়িয়ে থাকা সাদা পাথরের ঝলমলে দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই সেখানে ছুটছেন হাজারো মানুষ। পাহাড়ি ঢল নামলে নদীর পানি আরও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে, যা দর্শনার্থীদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে। সিরাজগঞ্জ থেকে আসা এনজিও কর্মকর্তা মুরাদুল ইসলাম দিদার জানান, সন্তানদের আবদারে এনিয়ে চারবার সাদাপাথরে আসছেন তিনি; তবে সাঁতার না জানা লোকদের নদীতে না নামার পরামর্শ দেন তিনি, কারণ এখানে পানির স্রোত অত্যন্ত বেশি।
স্থানীয় সাদাপাথর গেস্টহাউসের ব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম জানান, ঈদ উপলক্ষে পর্যটকের চাপে দীর্ঘদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে উঠছেন তারা এবং নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও ভাড়া নির্ধারণে প্রশাসনের তদারকির কারণে পর্যটকরাও খুশি। গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং, বিছনাকান্দি ও রাতারগুল এলাকায়ও পর্যটকদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো এবং ঈদের আগেই অধিকাংশ আবাসিক হোটেলের কক্ষ বুকিং হয়ে গিয়েছিল।
ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা জাফলং এলাকায় পিয়াইন নদীর বুকে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য পাথর ও স্বচ্ছ জলধারা এবং দূরে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ছোট ছোট ঝরনার দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করছে। ঈদের দিন তুলনামূলক কম ভিড় থাকলেও পরদিন থেকেই সেখানে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। নৌঘাট থেকে মূল পর্যটন এলাকা পর্যন্ত সর্বত্র ছিল মানুষের আনাগোনা এবং অনেকেই পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নদীর পানিতে নেমে আনন্দে মেতে ওঠেন। এ ব্যাপারে বৃহত্তর জাফলং পর্যটন কেন্দ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. হোসেন মিয়া জানান, এবার ঈদের ছুটিতে অনেকটা ভালো ব্যবসা হয়েছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকলে বিগত সময়ের লোকসান অনেকটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
স্থানীয় হাজী সোনা মিয়া রিসোর্টের মালিক খায়রুল মিয়াও একই আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং বলেন, দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় এবার পর্যটক অনেক বেশি এসেছেন। গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে আসা বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ সরকার জানান, বছর দশেক আগে এসেছিলেন; এবার অনেকটা ভালো লেগেছে, তবে খোড়াখুড়ির কারণে আগের মতো পাথরের দেখা মিলছে না বলে আক্ষেপ করেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল থেকেই দলবেঁধে পর্যটকরা বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরছেন এবং অনেকেই নৌকায় করে ঝরনা, খাসিয়া পল্লি ও আশপাশের চা-বাগান পরিদর্শনে যাচ্ছেন। পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতিতে স্থানীয় অর্থনীতিতে পড়েছে ইতিবাচক প্রভাবÑ নৌকার মাঝি, হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, ট্যুর গাইড ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সকলেই ব্যস্ত সময় পার করছেন। ট্যুরিস্ট পুলিশ সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উৎপল কুমার চৌধুরী জানান, পর্যটন স্পটগুলোতে সার্বক্ষণিক টহল জোরদার রাখা হয়েছিল এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হয়, যে কারণে এবার কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন