সিলেট

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মাদকের আসর

নিরাপত্তাহীনতায় রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মী

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ ১৫:১৫

গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে জনগণ মৌলিক চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্য পরামর্শ, মাতৃস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবা পেয়ে থাকে। তবে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৬নং দক্ষিণ রনিখাই ইউনিয়নের সুন্দাউরা গ্রামে অবস্থিত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের চিত্র যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। 


অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের পরিবেশ নষ্ট করে কেন্দ্রটিকে মাদকসেবনের আখড়ায় পরিণত করেছে কতিপয় মাদকসেবী। 


স্থানীয়দের দাবি, শুধু রাতেই নয়, দিনের বেলাতেও সেখানে প্রকাশ্যে মাদকসেবন চলে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার কারণে তাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না। স্থানীয় কিছু মাদক কারবারি বহিরাগতদের এখানে মাদক সেবনের সুযোগ করে দেয় বলে তাদের অভিযোগ। 


সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির পেছনের ভবনের ভেতর ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে ভারতীয় মদ ও বিয়ারের খালি ক্যান, ফেনসিডিলের বোতল, সিগারেটের প্যাকেট এবং কার্টনের কাগজ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এসব আলামত থেকে ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রটির নির্জন অংশে নিয়মিত মাদকসেবনের কার্যক্রম চলে আসছে। 


স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে বর্তমানে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা ছাড়া অন্য কোনো কর্মকর্তা বা কর্মী দায়িত্বে নেই। এমনকি পিয়ন বা নৈশপ্রহরীও নেই। তিন দিক সীমানা প্রাচীর থাকলেও সামনের অংশ খোলা। ভবনগুলোও দীর্ঘদিনের পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে স্থানীয়দের দাবি। বাহ্যিকভাবে রং করা হলেও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। 


স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা নারী, শিশু ও বয়স্ক রোগীরা এমন পরিবেশে বিব্রত ও আতঙ্কিত বোধ করেন। ফলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং সেবার মানও ব্যাহত হচ্ছে। প্রশাসনের দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ চান বলে তারা জানান। 


স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির উপদেষ্টা উচতার আলী বলেন, “রাতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। খাগাইল বাজার বা হায়দরি বাজারে যত মানুষ থাকেন, প্রায় সমসংখ্যক মাদকসেবী রাতে সেখানে আসে। তারা স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে শহর থেকে আসে।”


ইউপি সদস্য আলী হোসেন বলেন, “আমরা চাই প্রশাসন মাদকের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। মাদক নির্মূল না হলে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে এবং এলাকার যুবসমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
এ বিষয়ে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) বদরুল ইসলাম বলেন, “কেন্দ্রে একজন পরিদর্শিকা একাই দায়িত্ব পালন করছেন, অন্য কোনো জনবল নেই। অনেক সময় মাতালদের উৎপাত ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাঁকে দরজায় তালা লাগিয়ে ডিউটি করতে হয়। আমি কোম্পানীগঞ্জে অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছি, তাই প্রতিদিন সেখানে যাওয়া সম্ভব হয় না। স্থানীয় জনগণ সচেতন হয়ে এলাকা মাদকমুক্ত করতে উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বিষয়টি প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।”


এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) সুজন চন্দ্র কর্মকারের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। 


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিন মিয়া বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অবস্থান কঠোর। এ বিষয়ে দেখাদেখি বা ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”


এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের অনুমোদিত ৪২টি পদের মধ্যে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ ১৩টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। তবে গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বর্তমানে এখানে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতি ইউনিয়নে ৪ থেকে ৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও কোনো কোনো এলাকায় প্রায় এক যুগ ধরে প্রয়োজনীয় জনবল নেই। 


উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ২নং পূর্ব ইসলামপুর ও ৫নং উত্তর রনিখাই ইউনিয়নে এখনও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র স্থাপিত হয়নি। ফলে ওইসব এলাকার বাসিন্দারা পরিবার পরিকল্পনার সহায়ক ওষুধ ও সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে অনাকাক্সিক্ষত জন্মহার বৃদ্ধির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 


নিয়ম অনুযায়ী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে জন্মনিয়ন্ত্রণ, মা ও শিশুস্বাস্থ্য এবং কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়। এছাড়া আয়রন, ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, ক্যালসিয়াম, কৃমিনাশক, প্যারাসিটামল, হিস্টাসিনসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সরবরাহের কথা রয়েছে। 


স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদার, নিয়মিত নজরদারি, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাদের মতে, জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে আগে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে মাদকমুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। 
 

সিলেট থেকে আরো পড়ুন