ছবি : সংগৃহীত
ফুটবল বিশ্বকাপ বাংলাদেশের মানুষের কাছে শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, বরং এক অনন্য আবেগের নাম। বিশ্বকাপ এলেই দেশজুড়ে শুরু হয় উৎসবের আমেজ। প্রিয় দলের জার্সি গায়ে চাপানো, বাড়ির ছাদে পতাকা ওড়ানো এবং রাত জেগে খেলা দেখা—সব মিলিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় ভিন্ন এক উন্মাদনা। চার বছর পর আবারও সেই আবেগের জোয়ারে ভাসছে দেশের কোটি কোটি সমর্থক।
এই আবহের মধ্যেই আগামীকাল রবিবার (১৪ জুন) বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় মাঠে নামছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘সি’-এর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল মরক্কো।
দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে বিশ্বকাপ শিরোপার অপেক্ষায় রয়েছে ব্রাজিল। সর্বশেষ ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর প্রতিটি আসরেই কোনো না কোনো ইউরোপীয় দলের কাছে হতাশাজনক বিদায় নিতে হয়েছে সেলেসাওদের। ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, বেলজিয়াম কিংবা ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পরাজয় ব্রাজিলের বিশ্বকাপ যাত্রাকে বারবার থামিয়ে দিয়েছে।
তবে এবার ভিন্ন এক বাস্তবতায় বিশ্বকাপ মিশনে নেমেছে ব্রাজিল। নিজেদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে দলটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কিংবদন্তি ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তির হাতে। ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বিদেশি কোচের অধীনে বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে ব্রাজিল। ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে অসামান্য সাফল্যের অধিকারী আনচেলত্তির নেতৃত্বে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে সাম্বার দেশের সমর্থকরা।
বিশ্বকাপে ব্রাজিল ও মরক্কোর মুখোমুখি হওয়ার ইতিহাস খুব বেশি সমৃদ্ধ নয়। দুই দলের একমাত্র বিশ্বকাপ সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে। সেবার রোনালদো ও রিভালদোদের ব্রাজিল ৩-০ গোলের জয় পেয়েছিল। তবে বর্তমান মরক্কো দলকে সেই অতীতের পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করার সুযোগ নেই।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়া মরক্কো ইতোমধ্যেই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের শেষ চারে পৌঁছে তারা বিশ্ব ফুটবলে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জমাট রক্ষণভাগ, সংগঠিত দলগত খেলা এবং দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণই দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও আনচেলত্তির অধীনে অনেকটাই ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে ব্রাজিল। দলটির আক্রমণভাগে নেতৃত্ব দেবেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া এবং তরুণ প্রতিভা এন্দ্রিক। মাঝমাঠে কাসেমিরো ও ব্রুনো গুইমারেসের অভিজ্ঞতা এবং রক্ষণে মারকুইনহোসের নেতৃত্ব ব্রাজিলকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে। গোলপোস্টে থাকবেন অভিজ্ঞ গোলরক্ষক আলিসন বেকার।
অন্যদিকে মরক্কোর শক্তির কেন্দ্রবিন্দু তাদের রক্ষণভাগ। বিশ্বসেরা রাইট-ব্যাকদের একজন আশরাফ হাকিমি, মিডফিল্ডার সুফিয়ান আমরাবাত, আক্রমণভাগের ব্রাহিম দিয়াজ এবং নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দলটির কৌশল। বড় দলগুলোর বিপক্ষে সুযোগ কাজে লাগিয়ে চমক দেখানোর সামর্থ্য তাদের রয়েছে।
কাগজে-কলমে গ্রুপ ‘সি’-এর সবচেয়ে শক্তিশালী দুই দল ব্রাজিল ও মরক্কো। গ্রুপের অপর দুই দল স্কটল্যান্ড ও হাইতি হলেও গ্রুপ সেরার লড়াইয়ে এই ম্যাচকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, বলের দখল ধরে রেখে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে চাইবে ব্রাজিল, আর মরক্কো অপেক্ষা করবে দ্রুত পাল্টা আক্রমণের সুযোগের জন্য।
বিশেষ করে ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমির মধ্যকার লড়াই ম্যাচের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে। এই দ্বৈরথ ম্যাচের ফল নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য ভোর ৪টার এই ম্যাচ শুধুমাত্র একটি খেলা নয়; এটি বিশ্বকাপের চিরচেনা আবেগ, উত্তেজনা এবং প্রত্যাশার আরেকটি অধ্যায়। আনচেলত্তির কৌশলে ব্রাজিল কি জয়ের সূচনা করবে, নাকি মরক্কো আবারও বিশ্বমঞ্চে নতুন কোনো অঘটনের জন্ম দেবে—সেই উত্তর মিলবে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে।
সি/মা/ডেস্ক/এসসিজে
খেলাধুলা থেকে আরো পড়ুন