বিশেষ প্রতিবেদন

শাহজালাল (রহ.) মাজার বিতর্ক

ডিসি সারওয়ার অধ্যায়ের যবনিকা

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ ০০:৫৫

সিলেটের কয়েক শত বছরের ঐতিহ্যবাহী হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও দানবাক্স সিলগালা করা নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া তুমুল আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই অবসান ঘটল জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলমের অধ্যায়ের। মাজার-কাণ্ড নিয়ে বিতর্কের মুখে প্রত্যাহারের মঙ্গলবার দুপুরে সিলেট ছেড়েছেন তিনি। এর আগে বিদায়লগ্নে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক আবেগঘন পোস্টে তিনি লেখেন, ‘বিদায় সিলেট। ভালো থাকুন সিলেটবাসী। আপনাদের ভালোবাসায় আমি ধন্য।’

 

সিলেট থেকে প্রত্যাহারের আদেশ আসার পরদিন, অর্থাৎ সোমবার (২২ জুন) বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের উদ্যোগে প্রচলিত রেওয়াজ ভেঙে কয়েক শত বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের টাকা প্রকাশ্যে গণনা করা হয়।

জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাজারের ৩টি ডেগ ও ১টি দানবাক্স খুলে মাত্র ৪ দিনের গণনায় পাওয়া গেছে নগদ ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৯ টাকা এবং ৭ আনা সোনা। এছাড়া কিছু বিদেশি মুদ্রাও মিলেছে। যেখানে মাজার ভক্তদের সংগঠনের ধারণা ছিল দৈনিক ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা উঠতে পারে, সেখানে মাত্র ৪ দিনেই সাড়ে ১৭ লাখ টাকা পাওয়ার পর মাজারের মাসিক ও বার্ষিক আয় নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে কৌতূহল ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

 

প্রকাশ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ আসার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই টাকা কার কাছে থাকবে এবং কীভাবে ব্যয় হবে?

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন জানিয়েছেন, মাজারের এই অর্থ সোনালী ব্যাংকে মাজারের নামে খোলা একটি নতুন অ্যাকাউন্টে রাখা হবে এবং পরবর্তীতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিদায়ের আগে সারওয়ার আলমও দাবি করেছিলেন, এই টাকা সরকার নেবে না; জেলা প্রশাসক ও ওয়াকফ ইন্সপেক্টরের যৌথ অ্যাকাউন্টে রেখে তা মাজারের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় মাজার কর্তৃপক্ষ এবং ওয়াকফ এস্টেটের মাধ্যমেই ব্যয় করা হবে।

 

তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে দাবি করছে মাজার কর্তৃপক্ষ। তাদের অভিযোগ, এই অর্থ ব্যবস্থাপনা বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়ায় তাদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছে। হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না জানান:

 

"আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে শুনেছি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। তবে এতে আমাদের কাউকে সম্পৃক্ত করা হয়নি, এমনকি জানানোও হয়নি। সোমবারের টাকা গণনার বিষয়টিও আমাদের অবহিত করা হয়নি।"

 

একই সুর মেলালেন আশেকানে আউলিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান জামান চৌধুরীও। তিনি জানান, টাকা কীভাবে বা কারা ব্যয় করবে সে বিষয়ে মাজার সংশ্লিষ্ট কেউ কিছুই জানেন না।

 

মাজারে আয়ের স্বচ্ছতা আনার যুক্তি দেখিয়ে গত ১৮ জুন মাজারের দানের ৩টি ঐতিহ্যবাহী ডেগ সিলগালা করে জেলা প্রশাসন। একই সাথে সিসি ক্যামেরা ও আনসার পাহারায় নতুন দানবাক্স বসানো হয়।

এই পদক্ষেপের পরেই মাজার সংশ্লিষ্ট ও ভক্তদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। খাদেমদের দাবি, মাজারবিরোধী একটি চক্রের ইন্ধনে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও রেওয়াজ ভেঙে এই প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। নাগরিক সংগঠকদের মতে, জেলা প্রশাসনের এই আকস্মিক উদ্যোগ মাজার অনুসারী ও কওমি ঘরানার মানুষকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

 

মাজারের অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে নাগরিক সংগঠক আব্দুল করিম কীম জানান, আগে মানুষ টাকা নয়, বরং গাছের ফল, সবজি বা গৃহপালিত পশু দান করতো। পর্যটক ইবনে বতুতা থেকে শুরু করে কবি জসিমউদ্দীন—যারাই সিলেটে এসেছেন, সবার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা মাজার কর্তৃপক্ষই করতো।

খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না জানান, হযরত শাহজালাল (রহ.) অবিবাহিত থাকায় তাঁর জীবিতাবস্থাতেই ভাগনের পরিবারের খরচের জন্য মাজারের আয়ের একটি অংশ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। বর্তমানে সেই ভাগনের উত্তরসূরি প্রায় ৩০০টি পরিবার (সরওকুম, মুফতি ও সৈয়দ পরিবার) সিলেটে রয়েছে। ‘বাড়ি প্রথা’ অনুযায়ী প্রতিদিন একেকটি পরিবার মাজারের তদারকি, কর্মীদের বেতন ও লঙ্গরখানার খরচ নির্বাহের পর উদৃত্ত অংশ হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। তারা কখনোই দানের জন্য কোনো প্রচার চালান না, ভক্তরা নিজেদের ভালোবাসা থেকেই দান করেন।

 

 

২৭তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলম পূর্বে র‍্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিন শতাধিক সফল ভেজালবিরোধী অভিযান চালিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রশংসিত ও আলোচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে পদোন্নতিবঞ্চিত হয়ে ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করায় ২০২২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে 'তিরস্কার' সূচক লঘুদণ্ডও পেয়েছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের আগস্টে উপসচিব হওয়া এই কর্মকর্তা সিলেটে যোগ দেওয়ার পর শুরুতে প্রশংসিত হলেও মাজার ইস্যুতে শেষ রক্ষা হলো না তাঁর।

 

গত ২১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। প্রজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করা হলেও মাজার-কাণ্ডের জের ধরেই যে এই দ্রুত অপসারণ, তা গত কয়েকদিনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

 

সোমবার বিকেলে তিনি সিলেটের বর্তমান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি দাসের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন এবং আজ মঙ্গলবার দুপুরে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে সিলেট ত্যাগ করেন।মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগদানের কথা রয়েছে।

বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন