সিলেটের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ শরিফ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই মাজার সুফি ঘরানার মানুষদের মিলনকেন্দ্র। একে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক অনন্য মাজার সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক আবহ। প্রতিদিন অগণিত মানুষ এখানে আসেন মানসিক শান্তি ও পুণ্য লাভের আশায়। আর এই ভক্তি থেকেই আসে এক অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব— মানুষ পৃথিবীর অন্য কোথাও হিসাব ছাড়া দান না করলেও, মাজারের সিন্দুকে বা ডেগগুলোতে বিনা প্রশ্নে অর্থ দান করে যায়। এটি ভক্তদের বিশ্বাসের অংশ। ভক্তের ভক্তি এবং এই মানত ও দানের অর্থমূল্য যতখানি, তার চেয়ে বেশি এর আধ্যাত্মিক মূল্য।
গত মাসে স্বচ্ছতার নামে সিলেট জেলা প্রশাসনের এখতিয়ার বহির্ভূত হস্তক্ষেপ এবং মাজার-সংস্কৃতি বহির্ভূত কিছু মানুষের নানা প্রস্তাবনা, সামাজিক মাধ্যমে মাজার সংশ্লিষ্টদের নিয়ে নানা অপপ্রচার নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মাজারের ঐতিহাসিক অধিকার ও এর গাম্ভীর্য অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে এর একটি সুষ্ঠু ও বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে, তা খোঁজা দরকার। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি এটা নিয়ে কাজ করছে। তারা অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং আশা করছি এখান থেকে একটা টেকসই সমাধান বের হয়ে আসবে।
মাজারে ভক্তের মানত ও দানের অর্থ নিয়ে যারা বাইরে থেকে নানা ফতোয়া বা প্রস্তাব দিচ্ছেন, তারা মাজার-সংস্কৃতিধারীদের মনস্তত্ত্ব ও বাস্তবতা হয়তো বোঝেন না। দরগাহ শরিফের এই নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যেই কিন্তু দানের অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। এখানে রয়েছে দুটি মসজিদ, যেগুলোর জন্য পৃথক দানবাক্স আছে। রয়েছে কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানা, দর্শনার্থীরা চাইলে সরাসরি সেখানেও দান করতে পারেন এবং করেনও। লঙ্গরখানায়ও মানুষ নানাভাবে তাদের দান ও মানতের সামগ্রী দিয়ে থাকে। এর বাইরেও মাজার এলাকায় অনেক ভাসমান ভিক্ষুক রয়েছেন, যাদের দর্শনার্থীরা আর্থিক সাহায্য করেন।
এতসব বিকল্প থাকার পরেও মানুষ যখন মাজারের মূল ডেগে টাকা দেয়, তখন তারা খুব নির্দিষ্ট নিয়ত ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস থেকেই দেয়। তারা ভালো করে জানে এই টাকা হাসপাতালের জন্য নয়, মসজিদের জন্য নয়, মাদ্রাসার কিংবা এতিমখানার জন্যও নয়। তারা বিশ্বাস করে, আল্লাহর ওলির এই পুণ্যভূমিতে দান বা মান্নত করলে তাঁর উসিলায় আল্লাহ তাদের মনের আশা পূরণ করবেন। ভক্তদের এই সুফি ঘরানার আধ্যাত্মিক বিশ্বাসকে আমাদের মূল্য দিতে হবে। মানুষ যেখানে নির্দিষ্ট নিয়তে টাকা দিচ্ছে, সেই টাকা জোর করে অন্য খাতে নিয়ে হাসপাতাল বা রাস্তাঘাট বানানোর প্রস্তাব কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শাহজালালের দরগাহ কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। এখানে ওরসের জন্য বা পৃথক কোনো অনুষ্ঠানের জন্যে আলাদা করে কোনো ব্যানার, ফেস্টুন বা তোরণ টানিয়ে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে টাকা তোলা হয় না। মাজার সংশ্লিষ্ট কেউ কখনো কোনো দর্শনার্থীকে টাকা দিতে প্ররোচিত বা বাধ্য করে না। তবু মানুষ ভালোবেসে টাকা দেয়। আর আল্লাহর ওলির প্রতি ভালোবাসার এই দানের টাকা ভোগদখল ও উত্তরাধিকারের অধিকার সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত আইনিভাবে নানা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক স্বীকৃত।
আজ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে, মাজার এলাকায় আলো-ঝলমলে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও দোকানপাট হয়েছে, লোকসমাগম বেড়েছে। কিন্তু একটা সময় যখন এখানে কোনো রাস্তাঘাট বা সুযোগ-সুবিধা ছিল না, তখন কিন্তু এই মাজারের দেখভাল করা পরিবারগুলোই বংশানুক্রমিকভাবে শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মাজারের শৃঙ্খলা রক্ষা করেছে, দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের খেদমত করেছে— এখনও করছে। সিলেটে মাত্র দু-চারটি পরিবার নয়, বরং কয়েকশ পরিবার মাজারের এই ঐতিহাসিক সেবার সাথে যুক্ত এবং তাদের জীবিকা ও অধিকার এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
জেলা প্রশাসনের অযাচিত হস্তক্ষেপের পর মাজার সংস্কৃতি লালন না করা এবং মাজার-সংস্কৃতিবিদ্বেষীদের অনেকেই মাজারে জমা হওয়া অর্থের হিসাব চাইছেন। শত শত বছর ধরে বিবিধ প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে যারা মাজারের খেদমত করে গেছেন, তাদেরকে আজ কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদেরকে সামাজিক ও জাতীয়ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে সম্ভব সবকিছু করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই তাদের প্রাপ্য ছিল না। মাজার থেকে প্রাপ্ত অর্থ তারা জবরদস্তিমূলক অথবা প্রতারণামূলকভাবে ভোগ করছেন— বিষয়টি এমন নয়। সুলতানি আমল, মোগল আমলের তৎকালীন শাসকদের কর্তৃক সরাসরি আদেশনামা এবং হাল আমলের উচ্চ আদালত তাদেরকে বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত এই সুযোগ-সুবিধাকে আইনি অধিকার দিয়ে রেখেছে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের অনেক আলোচনা সাতশ বছরের পুরনো প্রথা ও রীতিকে সম্পূর্ণ রূপে অগ্রাহ্য করেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য, এর পথ তৈরি করে দিয়েছেন সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক ও সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম। ডিসি ও ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব যিনি পালন করছিলেন সিলেটে, তার উচিত ছিল প্রথা-রীতি ও আদালতের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করা; কিন্তু তিনি তা করেননি। ফলে আজ এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তবে যে-কোনো ঝড় শেষে যেমন শান্ত-স্থির হয় প্রকৃতি, তেমনি আমরাও আশা করি তেমনটাই ঘটবে শাহজালালের মাজার প্রাঙ্গণে। যে মাজার সিলেটের প্রধান আধ্যাত্মিক কেন্দ্র, সেখানে শান্তির প্রত্যাশা নিশ্চয় অমূলক নয়। একবার যখন মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেই গেছে, তখন আমাদের সামনে সুযোগ এসেছে এর একটি স্থায়ী সমাধান বের করার।
খাদিম-নিয়ন্ত্রিত আধ্যাত্মিক কল্যাণ ট্রাস্ট
হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার একটা-দুইটা নির্দিষ্ট পরিবার রক্ষণাবেক্ষণ করেন না; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কয়েকশ পরিবার। ভবিষ্যতে এ সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই বাড়বে। সেক্ষেত্রে মাজারের পবিত্রতা রক্ষা, বাইরের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ, নিজেদের মধ্যে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং খাদিমদের স্বার্থ শতভাগ সুরক্ষিত রাখতে একটি স্বায়ত্তশাসিত ‘খাদিম-নিয়ন্ত্রিত আধ্যাত্মিক কল্যাণ ট্রাস্ট’ গঠন করা যেতে পারে। এই ট্রাস্টের সম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে বংশানুক্রমিক খাদিমদের হাতেই। বাইরের কোনো আমলাতান্ত্রিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এতে থাকবে না, যাতে মাজারের নিজস্ব রীতিনীতি ও গাম্ভীর্য সুরক্ষিত থাকে। তারা প্রচলিত ধারার মতোই মাজার পরিচালনা করবেন। বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছে তারা এক্ষেত্রে খাদিম পরিবারগুলো বিশেষ করে তাদের প্রতিনিধি মোতোয়াল্লিকে এক্ষেত্রে এইধরনের ট্রাস্ট গঠনের পরামর্শ দিতে পারে।
অর্থের সুনির্দিষ্ট বণ্টন নীতি:
সংগৃহীত অর্থকে প্রধানত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ভাগে বিন্যস্ত করা যেতে পারে:
১. খাদিমদের সম্মানী ও মাজার পরিচালনা: ডেগে জমা হওয়া টাকা সরাসরি কয়েকশ খাদিম পরিবারের কল্যাণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মাজারের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের জন্য আদালতের নির্দেশনানুযায়ী বরাদ্দ থাকবে।
২. স্থাপত্য ও হেরিটেজ সংরক্ষণ: শাহজালালের মাজার সিলেটের অন্যতম প্রধান সুলতানি ও মোঘল আমলের স্থাপত্য নিদর্শন। এই ঐতিহাসিক কাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং এর মূল সৌন্দর্য ধরে রাখার জন্য একটি স্থায়ী ফান্ড থাকবে। এটি নিয়ন্ত্রণে খাদিম পরিবারগুলোর প্রতিনিধি ও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি পৃথক কমিটি করা যেতে পারে। একই সাথে মাজারের সীমানায় থাকা মসজিদ ও মাদ্রাসার প্রতিনিধিত্বও থাকতে পারে।
৩. লঙ্গরখানা: মাজারের লঙ্গরখানাকে আরও সুশৃঙ্খল করা, যেখানে প্রতিদিন শত শত অসহায় মানুষ নিখরচায় খাবার পেতে পারেন। এর ব্যয় নির্বাহ খাদিম পরিবারগুলো আগে যেভাবে নিজেদের দায়িত্বে করতেন, সেভাবেই করে যাবেন।
৪. জনমত ও প্রশাসনের সমন্বয়ে বিকল্প উন্নয়ন ধারণা: সাবেক জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের মাজার সংস্কৃতিতে একপ্রকার আঘাত হেনে স্বচ্ছতার নামে সিন্দুক স্থাপন করার পর আমরা এক ভিন্ন বাস্তবতা ও মনস্তত্ত্ব লক্ষ্য করেছি। বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে আনা সিন্দুক স্থাপনের চারদিন পর খুলে যখন প্রায় ১৮ লাখ টাকা জমার কথা জানানো হলো, তখন জনসাধারণের মনে একটি সাধারণ ধারণা জন্মে গেল যে এখানে হয়তো কোটি কোটি টাকা ওঠে। কিন্তু পরবর্তী ডেটা বা পরিসংখ্যান আমাদের প্রথম ধাক্কা দেয়—যখন দেখা যায় ১৮ দিনের মোট হিসাবে উঠেছে মাত্র ৪৭ লাখ টাকা। শুধু তাই নয়, সংগৃহীত নোটের চরিত্রের দিকে তাকালে আরেকটি বড় সত্য সামনে আসে। প্রথমবার নতুন করে স্থাপিত দানবাক্সে উঠেছিল মূলত ১০০০ ও ৫০০ টাকার বড় বড় নোট বেশি, যা প্রথাগত মাজার সংস্কৃতির দান নয়; বরং পরবর্তীতে উঠেছে মাজার সংস্কৃতির চিরচেনা ছোট ছোট নোটের স্তূপ।
এই যে প্রশাসনিক তৎপরতা থেকে তৈরি হওয়া একধরনের সামাজিক ও উন্নয়নমূলক পূর্বধারণা এবং সন্দেহ— সেটিকে বাস্তবতার নিরিখে এখন চাইলেই পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা যাবে না। যেহেতু একটি পক্ষ মাজারের টাকা দিয়ে উন্নয়নমূলক কাজ করতে চায়, তাই এই দ্বন্দ্বের অবসানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান হতে পারে— মাজার প্রাঙ্গণেই ‘সিলেটের উন্নয়ন’ নামে একটি পৃথক দানবাক্স স্থাপন করা। এই নির্দিষ্ট বাক্সের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে জেলা প্রশাসন বা তাদের মনোনীত কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকতে পারে। মাজারের আধ্যাত্মিক টানে এসেও যারা সিলেটের সামাজিক উন্নয়নে শরিক হতে চান, তারা ওই নির্দিষ্ট বাক্সে দেবেন। এতে করে ভক্তদের মানত, নিয়ত বা বিশ্বাসের ওপরও জোর খাটানো হবে না, আবার শত শত বছর ধরে মাজারের খেদমত করে আসা মানুষেরা অসম্মান থেকে রক্ষা পেলেন।
আরও কিছু উপায়:
• স্বেচ্ছাধীন স্বচ্ছতা ও অপপ্রচার বন্ধ: জেলা প্রশাসনের দানবাক্স খোলার পর যে কোটি কোটি টাকার একটি কাল্পনিক সামাজিক ধারণা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে 'স্বেচ্ছাধীন স্বচ্ছতা' হতে পারে অন্যতম উপায়। যেহেতু ট্রাস্ট মাজার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা পরিবারগুলোর সমন্বয়ে গঠিত হবে, সেহেতু তারা তাদের নিজেদের মধ্যে অর্থ আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
এরবাইরে সিলেটের উন্নয়ন বাক্স, চ্যারিটি ফান্ড বাক্স, স্থাপত্য ও হেরিটেজ ফান্ড, খাদিমদের সম্মানী ও মাজার পরিচালনা ব্যয়, লঙ্গরখানার ব্যয়ের হিসাব প্রতি বছর বা প্রতি ছয় মাস পর পর অডিট করিয়ে মাজারের নোটিস বোর্ডে এবং অথবা গণমাধ্যমে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণী প্রকাশ করা যেতে পারে। যখন মানুষ দেখবে মাজারের বিশাল দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ নিয়মতান্ত্রিকভাবে হচ্ছে, তখন বহিরাগতদের মনগড়া দাবির আর কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকবে না।
• দান ও মান্নতের আইনি ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা: মাজারের অর্থ নিয়ে সাম্প্রতিক প্রচার-প্রচারণা ও অপপ্রচার এবং এই অর্থ দিয়ে নানামুখী উন্নয়নের দাবির প্রেক্ষিতে দান ও মানতের ধর্মীয় ও আইনি ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ইসলামিক আইন এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী— কোনো ভক্ত যখন নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা ওলির উসিলায় 'মানত' বা 'দান' করেন, তখন শরীয়া ও আইনগতভাবে সেই অর্থ কেবল সেই নির্দিষ্ট খাতেই ব্যয় করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই অর্থের চরিত্র কোনো সরকারি ট্যাক্স বা খাস জমির রাজস্বের মতো নয় যে সরকার তা দিয়ে সাধারণ অবকাঠামো বানাবে। এই আইনি ও ধর্মীয় বাধ্যবাধকতাটি জোরালোভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
• মাজারের নিজস্ব চ্যারিটি ফান্ড: মাজার দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ নিজস্ব উদ্যোগে একটি বিশেষ ‘শাহজালাল (রহ.) চ্যারিটি ফান্ড’ করতে পারে। এর নিয়ন্ত্রণ থাকবে খাদিমদের হাতেই, তবে সমাজসেবামূলক কাজের তদারকিতে সিলেটের সুধীসমাজের প্রতিনিধি থাকতে পারেন। মাজারের মূল আয়ের উদ্বৃত্ত, অথবা একটা অংশ, নানা ভাবে প্রাপ্ত অর্থের একটা অংশ থেকে আশেপাশের দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সহায়তা ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেওয়া যেতে পারে। মাজারের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় যখন এই সামাজিক কাজগুলো দৃশ্যমান হবে, তখন বহিরাগতদের অপপ্রচারের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হবে।
আরকটা বিষয়, সাম্প্রতিক উত্তুঙ্গু পরিস্থিতিতে অনেকেই কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের সাথে শাহজালালের মাজারের তুলনা টানছেন। তাদের প্রশ্ন— পাগলা মসজিদের টাকা জেলা প্রশাসন প্রকাশ্যে গুনতে পারলে শাহজালালের মাজারের টাকা কেন পারবে না? প্রশ্নটি শুনতে যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও, দুটি প্রতিষ্ঠানের আইনি কাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে এই তুলনা আসলে ধোপে টেকে না। পাগলা মসজিদ ‘ওয়াকফ এস্টেট’-এর অধীন একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, যা সরাসরি সরকারি কাঠামোর মধ্যে পড়ে বলেই এর টাকা জেলা প্রশাসন গণনা ও পরিচালনা করে। শাহজালালের মাজার কিন্তু ওয়াকফ এস্টেটের অধীন নয়, বরং এটি বংশপরম্পরায় নির্দিষ্ট পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণে থাকা একটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। শাহজালাল নিজে চির-অনূঢ় থাকায় তার সরাসরি রক্তসম্পর্কীয় উত্তরাধিকার নেই; বর্তমান পরিবারগুলো উচ্চ আদালতে তাদের উত্তরাধিকার সূত্র ও আইনগত অধিকার প্রমাণ করেই দেখভাল ও ভোগের অধিকার পালন করে আসছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা মাজার কীভাবে পরিচালিত হবে এবং দানের অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হবে, এই প্রশ্নের উত্তর আজ কোনো অমীমাংসিত বিষয় নয়; বরং মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক আইনিভাবে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তিকৃত একটি বিষয়।
মাজার নিয়ে নানামুখী আলোচনায় আপনারা যারা খাদেম পরিবারদের অধিকার ও অবদানকে অস্বীকার করেন, তাদের জ্ঞাতার্থে জানানো জরুরি যে, দরগাহ নিয়ে আইনি লড়াইয়ের ইতিহাস সুদীর্ঘ। দরগাহ কর্তৃপক্ষ ওয়াকফ প্রশাসক ও জেলা প্রশাসক, সিলেটসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালে ১০নং স্বত্ব মোকদ্দমা দায়ের করেন। মোকদ্দমায় দরগাহ-ই-হযরত শাহ জালালের সম্পূর্ণ নজর ও নিয়াজ (দান ও মানত) আদায় করার অধিকার বাদীগণের রয়েছে মর্মে এবং দরগাহের সম্পূর্ণ নজর ও নিয়াজের ওপর তাদের প্রথাগত ব্যক্তিগত খাদেমী বারিদারী অধিকার রয়েছে মর্মে ঘোষণা হওয়ার এবং বিবাদীগণ যাতে দরগাহ ব্যবস্থাপনায় বা বাদীগণের অধিকারে কোনরূপ হস্তক্ষেপ না করতে পারেন, সেই মর্মে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার ডিক্রি প্রার্থনা করেন। ওয়াকফ প্রশাসক ও জেলা প্রশাসক জবাব দাখিলক্রমে মামলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। মামলাটি পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালের ২৫ নং স্বত্ব মোকদ্দমা হিসাবে নম্বরভূক্ত হয়ে বিচারান্তে ১৯৭৫ সালে ডিসমিস হয়। অই রায়ের অসম্মতিতে বাদীপক্ষ মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে ১৯৭৬ সনের ১৪১ নং স্বত্ব আপিল দায়ের করেন। উক্ত আপিল শুনানি শেষে ২০১৪ সালে আদেশে মঞ্জুর হয় এবং বাদীর মামলায় ডিক্রি হয়। অই রায়, ডিক্রি অদ্যাবধি বলবত রয়েছে। সে হিসাবে খাদেম পরিবারগুলো অধিকার আইনিভাবে স্বীকৃত হয়। তবু যদি ওখানে হস্তক্ষেপ করতে চান, তবে সেটা হওয়া উচিত আইনিভাবে, জবরদস্তিমূলক ভাবে নয়।
হযরত শাহজালালের দরগাহ কোনো সাধারণ স্থাবর সম্পত্তি নয়, এটি একটি জীবন্ত আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য। এর সমাধান কোনো কঠোর সরকারি বা বাণিজ্যিক নিয়মে হতে পারে না। মাজারের অর্থ নিয়ে বাইরে থেকে যারা হাসপাতাল বা অন্য উন্নয়নের তত্ত্ব দিচ্ছেন, তারা আসলে মাজারের আবেদন ও মাজার সংস্কৃতিকেই ধ্বংস করতে চান। খাদিমদের মর্যাদা ও অধিকারকে সম্মানের সঙ্গে রেখে, মাজারের অর্থকে যদি তাদের মাধ্যমেই একটি সুশৃঙ্খল ট্রাস্টের অধীনে পরিচালনা করা যায় এবং পাশাপাশি জনমতের আকাঙ্ক্ষা পূরণে পৃথক উন্নয়ন বাক্স ও চ্যারিটি মডেল রাখা যায়, তবে তা যেমন বহিরাগত সমালোচকদের মুখ বন্ধ করবে, তেমনি মাজারের গাম্ভীর্য ও আধ্যাত্মিক-আভিজাত্য সমুন্নত থাকবে।
কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলামলেখক।
মুক্তচিন্তা থেকে আরো পড়ুন