ছবি: সংগৃহীত
শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠে মাঠে কাশফুলের দোলা আর শিউলির মিষ্টি সুবাস- প্রকৃতিজুড়েই যেন উৎসবের আগমনী বার্তা। ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে শঙ্খধ্বনি, চণ্ডীপাঠ আর আগমনী গানের সুরে জেগে উঠছে বাঙালির হৃদয়। পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে আজ শুরু হয়েছে দেবীপক্ষের আবহ। মহালয়াকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিরাজ করছে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দময় প্রতীক্ষা।
মহালয়া বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। একদিকে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা, অন্যদিকে অসুরবিনাশিনী দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা- এই দুইয়ের সম্মিলনে দিনটি পেয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। মহালয়ার মধ্য দিয়েই বাঙালির মনে দুর্গাপূজার অপেক্ষা আরও গভীর হয়ে ওঠে।
হিন্দু ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী, আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপক্ষের অবসান ঘটে। এদিন অনেকে নদী, পুকুর কিংবা অন্যান্য জলাশয়ের তীরে গিয়ে প্রয়াত পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করেন। জল, তিল ও মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে নিবেদন করা হয় শ্রদ্ধা। পূর্বপুরুষদের স্মরণ, তাঁদের অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে করা এবং পরিবারের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের মধ্য দিয়ে মহালয়া হয়ে ওঠে স্মৃতি ও কৃতজ্ঞতার দিন।
তবে মহালয়ার আবেদন কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নতুন দিনের প্রত্যাশায় এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক হিসেবেও দিনটির গুরুত্ব রয়েছে। পূর্বপুরুষদের স্মৃতি যেমন মানুষকে শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, তেমনি দেবীপক্ষের সূচনা জাগিয়ে তোলে নতুন আশাবাদ।
অশুভের বিনাশ, শুভশক্তির জয়
দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য হিন্দু ধর্মগ্রন্থের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রচনা মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত ‘দেবীমাহাত্ম্যম্’ বা শ্রীশ্রীচণ্ডীতে বর্ণিত হয়েছে। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবলোক বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে আবির্ভূত হন দেবী দুর্গা। দীর্ঘ সংগ্রামের পর তাঁর হাতে পরাজিত হয় মহিষাসুর। প্রতিষ্ঠিত হয় শুভশক্তির জয়।
এই পৌরাণিক কাহিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। দেবী দুর্গার আরাধনার মধ্য দিয়ে ভক্তরা সাহস, শক্তি, মমতা ও কল্যাণের প্রত্যাশা করেন। তাই মহালয়ার আগমনী বার্তা শুধু উৎসবের আনন্দ নয়, মানুষের জীবনে ন্যায় ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠার প্রেরণাও বহন করে।
মহালয়ার ভোর মানেই ‘মহিষাসুরমর্দিনী’
মহালয়ার সঙ্গে বাঙালির আবেগের অন্যতম অনুষঙ্গ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ। ভোরের আলো ফোটার আগেই বেতারযন্ত্রে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠান শোনার ঐতিহ্য বহুদিনের। বাণীকুমারের রচনা, পঙ্কজকুমার মল্লিকের সংগীত পরিচালনা এবং বিভিন্ন শিল্পীর পরিবেশনায় অনুষ্ঠানটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মহালয়ার ভোরকে বিশেষ আবেগে রাঙিয়ে রেখেছে।
চণ্ডীপাঠের গম্ভীর উচ্চারণ, স্তোত্র, সংগীত ও আবৃত্তির সম্মিলনে তৈরি এই অনন্য পরিবেশনা বাঙালির শারদীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে বেতারের পাশাপাশি টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে এই ঐতিহ্য। তবু মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ শোনার আকর্ষণ আজও অমলিন।
প্রকৃতিতে শরৎ, ঘরে ঘরে পূজার প্রস্তুতি
শরতের আগমনে প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সেজে ওঠে। নীল আকাশ, সাদা মেঘ, কাশফুলের দোলা আর শিশিরভেজা ঘাসে বাংলার চিরচেনা সৌন্দর্য ধরা দেয়। এই প্রকৃতির সঙ্গে বাঙালির দুর্গোৎসবের সম্পর্ক নিবিড়। ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঘরে শুরু হয় পূজার প্রস্তুতি, আর মণ্ডপে মণ্ডপে ব্যস্ততা বাড়ে প্রতিমা নির্মাণ, সাজসজ্জা ও আলোকায়ন নিয়ে।
প্রতিমাশিল্পীরা খড়ের কাঠামো, মাটি ও তুলির আঁচড়ে ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তোলেন দেবী দুর্গার প্রতিমা। কোথাও কোথাও মহালয়াকে ঘিরে প্রতিমার চক্ষুদানের রীতিও পালিত হয়। অঞ্চলভেদে এই প্রথার ভিন্নতা থাকলেও ভক্তদের কাছে এর রয়েছে বিশেষ আবেগ ও তাৎপর্য।
অন্যদিকে, পূজামণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা, পূজার উপকরণ সংগ্রহ এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রস্তুতি উৎসবের আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। নতুন পোশাক, স্বজনদের সঙ্গে মিলন, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়া কিংবা দূরে থাকা প্রিয়জনের ঘরে ফেরার অপেক্ষা—সব মিলিয়ে মহালয়া হয়ে ওঠে আনন্দের আগাম বার্তা।
মহালয়া ও দুর্গাপূজা এক নয়
মহালয়া এবং দুর্গাপূজা পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হলেও দুটি একই বিষয় নয়। মহালয়া মূলত পিতৃপক্ষের শেষ তিথি, যা পূর্বপুরুষদের স্মরণ এবং দেবীপক্ষের আগমনী আবহের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। অন্যদিকে, দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা পূজাপঞ্জিকা ও নির্ধারিত তিথি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়।
প্রচলিত বাঙালি সংস্কৃতিতে মহালয়ার সাত দিন পর দুর্গাপূজার মূল উৎসব শুরু হওয়ার ধারণা বহুল পরিচিত। তবে তিথি ও পূজাপঞ্জিকা অনুযায়ী দেবীর বোধন এবং পূজার আনুষ্ঠানিক সূচনায় ভিন্নতা থাকতে পারে। ফলে মহালয়াকে শারদীয় মাতৃআরাধনার আবেগময় সূচনা হিসেবে বিবেচনা করাই যথাযথ।
সম্প্রীতি ও মানবিকতার বার্তা
বাংলার উৎসব-ঐতিহ্যের অন্যতম শক্তি মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধন। দুর্গোৎসবকে ঘিরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বহু স্থানে গড়ে ওঠে সামাজিক মিলনমেলা। শুভেচ্ছা বিনিময়, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও পারস্পরিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে উৎসব ছড়িয়ে দেয় সৌহার্দ্যের বার্তা।
বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজে দুর্গোৎসব পারস্পরিক শ্রদ্ধা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মূল্যবোধকে সামনে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করে। দেবী দুর্গার আরাধনার তাৎপর্যও পূর্ণতা পায় মানুষের আচরণে সত্য, ন্যায়, দয়া ও সহমর্মিতার প্রতিফলনের মধ্য দিয়ে।
মহালয়া তাই শুধু একটি তিথি নয়; এটি স্মৃতি, বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও আশার সম্মিলন। পিতৃপক্ষের অবসানে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দেবীপক্ষের সূচনায় মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখে শান্তি, কল্যাণ ও মঙ্গলের।
শিউলির সুবাস, কাশফুলের দোলা আর চণ্ডীপাঠের সুরে আজ বাঙালির মনে বেজে উঠছে শারদীয় উৎসবের আগমনী বার্তা। প্রতীক্ষা এখন ঢাকের বাদ্য, আলোকোজ্জ্বল মণ্ডপ আর মাতৃবন্দনার। মহালয়ার এই শুভক্ষণে মানুষের প্রত্যাশা- অশুভের বিনাশ হোক, শুভশক্তির জয় হোক, সমাজ থেকে দূর হোক হিংসা ও বিদ্বেষ। ভালোবাসা, শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতার আলোয় উদ্ভাসিত হোক প্রতিটি হৃদয়।
সি/মা/ডেস্ক/এসসিজে
সারাদেশ থেকে আরো পড়ুন