ছবি: সিলেট মানচিত্র
শারদীয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে আজ শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে। দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এ উপলক্ষে সিলেটের পূজামণ্ডপগুলোতে শেষ হয়েছে প্রস্তুতি। প্রতিমা স্থাপন, সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জার কাজ সম্পন্ন করে এখন পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর অপেক্ষায় আয়োজক ও ভক্তরা।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সিলেট জেলা ও মহানগর মিলিয়ে ৬৩৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে জেলায় ৪৭৪টি এবং মহানগরে ১৬৩টি মণ্ডপ রয়েছে। জেলার মণ্ডপগুলোর মধ্যে ৪৪৮টি সর্বজনীন ও ২৬টি পারিবারিক। মহানগরে সর্বজনীন মণ্ডপ ১৪৭টি এবং পারিবারিক মণ্ডপ ১৬টি।
দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সিলেটে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। পূজামণ্ডপগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। অন্যদিকে, উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে ১৮টি নির্দেশনা দিয়েছে পূজা উদযাপন পরিষদ। জেলা ও মহানগর শাখার যৌথ উদ্যোগে গঠন করা হয়েছে ১১ সদস্যের মনিটরিং সেল।
হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হলেও মহাষষ্ঠীর বোধনের মাধ্যমে শুরু হয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। এদিন দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আমন্ত্রণ জানানো হবে। সন্ধ্যায় বিহিত পূজার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে বোধন ও অধিবাসের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী ও মহানবমীতে পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি ও আরতি অনুষ্ঠিত হবে। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের মূল আয়োজন।
শাস্ত্রীয় বর্ণনায় দেবী দুর্গাকে দুর্গতিনাশিনী ও অশুভ শক্তির বিনাশকারী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। শ্রীচণ্ডীসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আখ্যানে তাঁকে সকল দেবতার সম্মিলিত শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, বিভিন্ন দেবতার তেজে দেবীর আবির্ভাব ঘটে এবং দেবতারা তাঁকে বিভিন্ন অস্ত্র ও উপহার দিয়ে সজ্জিত করেন। মহাদেবের ত্রিশূল, বিষ্ণুর চক্র, ইন্দ্রের বজ্রসহ বিভিন্ন অস্ত্র দেবীর শক্তি ও অসুরবিনাশী রূপের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
দেবী দুর্গার সঙ্গে পূজিত হন বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবী সরস্বতী, ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মী, সিদ্ধিদাতা গণেশ এবং শক্তি ও বীর্যের প্রতীক কার্তিক। ধর্মীয় বিশ্বাসে, এই পূজার মধ্য দিয়ে শক্তি, জ্ঞান, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের আরাধনা করা হয়।
শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, দুর্গাপূজার প্রাচীন প্রচলিত সময় বসন্তকাল। চৈত্র মাসে অনুষ্ঠিত এ পূজা বাসন্তীপূজা নামে পরিচিত। তবে পুরাণ ও ধর্মীয় আখ্যান অনুযায়ী, রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় কামনায় শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন রামচন্দ্র। প্রচলিত বিশ্বাসে, রামচন্দ্রের এই শরৎকালীন পূজার ঐতিহ্য থেকেই শারদীয় দুর্গোৎসবের বিশেষ তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দুর্গাপূজা বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। পূজাকে কেন্দ্র করে নতুন পোশাক, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং মণ্ডপ পরিদর্শনে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে পূজামণ্ডপগুলো হয়ে ওঠে সামাজিক মিলনমেলার কেন্দ্র।
প্রচলিত শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এ বছর দেবীর আগমন ঘোড়ায়। ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ঘোড়ায় আগমনকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অস্থিরতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তবে ভক্তদের প্রত্যাশা, দেবীর আশীর্বাদে অশান্তি ও সংকট দূর হয়ে পৃথিবীতে শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হবে।
সিলেটে দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পূজা উদযাপন পরিষদের জেলা ও মহানগর শাখার বর্ধিত সভায় ১৮টি নির্দেশনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুই শাখার যৌথ উদ্যোগে গঠিত ১১ সদস্যের মনিটরিং সেল পূজামণ্ডপগুলোর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, যোগাযোগ ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবে। পূজা কমিটিগুলোকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতা, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সহযোগিতায় দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে উৎসব উদযাপনের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
সূচি অনুযায়ী, ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী, ১৭ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৮ অক্টোবর মহাঅষ্টমী, ১৯ অক্টোবর মহানবমী এবং ২০ অক্টোবর বিজয়া দশমী পালিত হবে। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা।
সি/মা/ডেস্ক/এসসিজে
সারাদেশ থেকে আরো পড়ুন