বিশেষ প্রতিবেদন

সীমানা বেকায়দায় নতুন প্রার্থীরা

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারী ২০২৬ ১৫:১৭

লেটে প্রার্থীদের নির্বাচনী দৌড় কোথাও বেড়েছে, আবার কোথাও কমেছে। নির্বাচনী এলাকার নতুন সীমানা নির্ধারিত হওয়ার কারণে কোথাও এলাকা কমেছে, কোথাও আবার একটু বেড়ে গেছে। সীমানা বাড়া ও কমায় লাভ এবং ক্ষতি দুটোই হয়েছে। কোনো এলাকায় প্রার্থীকে যেতে হচ্ছে না, কিন্তু আগে ওই এলাকায় গিয়েও দৌড়ঝাপ করতে হতো। এক্ষেত্রে প্রার্থী নির্বাচনী এলাকার কম সীমানার ভিতরে প্রচারণা করতে পারছেন। কিন্তু কিছু আসনের সীমানা বাড়ায় ওই সব নতুন এলাকার প্রার্থী পুরনো এলাকার ভোটারদের কাছে একদম অচেনা, অন্যদিকে কিছু পুরনো এলাকার প্রার্থীকে ওই নতুন এলাকার ভোটারদের কাছে যেতে হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সিলেট-২ আসনটি আগে বিশ^নাথ-ওসমানীনগর-বালাগঞ্জ আসন নিয়ে গঠিত ছিল। এবার আসনটির সীমানায় পরিবর্তন হয়েছে। সিলেট-২ আসন থেকে বালাগঞ্জকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বালাগঞ্জ এখন সিলেট-৩ আসনের নির্বাচনী এলাকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে। সিলেট-২ আসনের প্রার্থীদের এখন শুধু বিশ^নাথ-ওসমানী নগর এলাকার মানুষের কাছে ছুটে যেতে হচ্ছে। এতে প্রার্থীরা কিছু ফুরসত পেয়েছেন। কম সময়ে বিশ^নাথ-ওসমানীনগরে প্রচার-প্রচারণা করে প্রধান কার্যালয়ে ফিরে আসতে পারেন। তবে এখানে এলাকা কমে আসায় আক্ষেপও আছে। দেখা যাচ্ছে, ওই এলাকার মানুষের কাছে কোনো প্রার্থী খুবই জনপ্রিয় ছিলেন, কিন্তু এবার সীমানার কারণে তারা সেই প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে পারছেন না। 

সিলেট-২ (বিশ^নাথ-ওসমানী নগর) আসনের বিএনপির প্রার্থী ইলিয়াসপত্নী তাহসিনা রুশদীর লুনা বলেন,‘ বালাগঞ্জ আসনের মানুষ তাদের প্রিয় নেতা ইলিয়াস আলীকে খুব ভালোবাসেন। ওই এলাকার ভোটাররা ইলিয়াস আলীকে ভোট দিয়ে এমপি করেছিলেন। নতুন সীমানা কমে যাওয়ায় এখন আর বালাগঞ্জ উপজেলাকে আমরা পাচ্ছি না। এতে বালাগঞ্জে যেতে হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু ওখানকার মানুষের ভালোবাসা থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি।’

এদিকে, সিলেট-৩ ( ফেঞ্চুগঞ্জ-দক্ষিণ সুরমা-বালাগঞ্জ) তিনটি উপজেলা ও সিসিকের কয়েকটি ওয়ার্ড নিয়ে নতুন সীমানা বড় হয়েছে। আগে দক্ষিণ সুরমা ও ফেঞ্চুগঞ্জ ছিল। নতুন সীমানা বড় হওয়ায় প্রার্থীরা বাড়তি একটি উপজেলার মানুষের কাছে ছুটে যাচ্ছেন। একদিকে গেলে , অন্য উপজেলায় যেতে পারছেন না। তাই প্রতিদিন পালা করে একেক দিন একেক এলাকায় প্রচারণায় প্রার্থীকে যেতে হচ্ছে। এতে ভোটারদের চোখে কম দেখা যাচ্ছে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে। পুরনো সেই জৌলুস কমেছে। আবার নতুন যুক্ত হওয়ায় উপজেলা থেকে প্রার্থী হওয়ার কারণে পুরনো উপজেলার মানুষের কাছে নতুন সীমানার প্রার্থী অনেকটাই অচেনা মনে হচ্ছে। এমনই বেকায়দায় পড়েছেন সিলেট-৩ আসনের বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (রিক্সা) মার্কার প্রার্থী মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু। তিনি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী। ওই আসনে জামায়াতের লোকমান ছিলেন বিএনপির প্রার্থী যুক্তরাজ্যের সুপরিচিত নেতা এম এম মালিক। ধারণা করা হচ্ছিল, লোকমান-মালিকের শক্ত লড়াই হবে। কিন্তু জোটের বলি হতে হয়েছে মাওলানা লোকমানকে। তিনি সরে দাঁড়িয়েছেন, নতুন মুখ নতুন নির্বাচনী উপজেলা বালাগঞ্জের মুসলেহ উদ্দিন রাজু পেয়েছেন মনোনয়ন। দক্ষিণ সুরমা ও ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকার বহু ভোটার চেনেন-ই না। তার পরিচিতি উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা গহরপুরীর ছেলে হিসেবে, তা-ও এ পরিচিতি বালাগঞ্জ দেওয়ানবাজার কেন্দ্রীক বলেই মনে করছেন ভোটাররা। অন্যদিকে, বিএনপি নেতা এম এ মালিক দীর্ঘ ২১ বছর ছিলেন প্রবাসে। তার কাছে তিনটি উপজেলার সবটি-ই নতুন! কারণ তিনি দেশে ছিলেন না। তবে তিনি লন্ডনভিত্তিক সুপরিচিত থাকার সুবাদে খুব দ্রুত তিনটি উপজেলার মানুষের কাছে পৌঁছে গেছেন। তবু নির্বাচনী এলাকা বিস্তৃতি পাওয়ায় সকল মানুষের কাছে পৌঁছতে তাকে কসরত করতে হচ্ছে। কখনও সিএনজি অটোরিকশা, কখনও নৌকা, আবার কোথাও পায়ে হেঁটে দুর্গম প্রান্তিক পথে দৌঁড়ঝাপ করতে হচ্ছে। 

লালাবাজারের ভোটার জাকির আহমদ বলেন,‘ রাজু হুজুরের লিফলেটের ছবি খুব সুন্দর। মার্কা রিক্সা, তিনি নিজেও হঠাৎ প্রার্থী। সকল মানুষ উনাকে চিনে না। দক্ষিণ সুরমা আসনে লোকমানকে মোটামুটি মানুষে চিনতো, এখন রাজুকে প্রার্থী করায় উনাকে অনেক ভোটার চিনবে না।’

সিলেট-৩ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এম এ মালিক বলেন,‘ নির্বাচনী এলাকা বড় ও ছোট আমার কাছে তেমন পার্থক্য লাগছে না। কেননা, আমি দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলাম। তাই তিনটি উপজেলার মানুষের কাছেই দেশে আসার পরে ছুটে গিয়েছি। আমি দেখলাম, এসব এলাকার অনেক মানুষ রাস্তা, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। আমি চেষ্টা করবো, যদি এমপি হই, তাহলে এ আসনকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে গড়ে তুলবো।’

সিলেট-১ আসনে আগে সিসিকের ২৭টি ওয়ার্ড ছিল ও সদর উপজেলার ইউনিয়নগুলো একীভূত ছিল। কিন্তু বর্তমানে ওই আসনে সিসিকের আরও নতুন ওয়ার্ড বেড়েছে। এখন সিসিকের ৩৯টি ওয়ার্ড। প্রার্থীকে প্রতিটি ওয়ার্ডেই গণসংযোগ করতে হচ্ছে। এদিকে, সিলেট-১ আসনের সদর উপজেলার বিস্তৃতি কোম্পানিগঞ্জ, ছাতক, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, বিশ^নাথ সীমানার কাছাকাছি। প্রার্থী যদি নগরে আসেন, তবে সদরে যেতে পারছেন না। প্রচারণায় আচরণবিধি কড়াকড়ি থাকায় মাইকের ব্যবহারও কমে এসেছে। তাই প্রার্থীকে স্বশরীরে ওই সব এলাকায় যেতে হচ্ছে। এতে প্রচারণায় প্রার্থীকে দেখা যাচ্ছে কম। তবু অনেক প্রার্থী মনে করেন, আসন যত বড়, তত প্রার্থীদের দৌড়ও তত বড়। যা নির্বাচনী এলাকা বড় হলে প্রার্থীর কাজ করার সুযোগও বড়। 

জানতে চাইলে এ বিষয়ে সিলেট-১ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন,‘ মহানগরীর সকল ওয়ার্ডেই আমি সিডিউল অনুযায়ী ভোটারের কাছে যাচ্ছি। সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামের মানুষের কাছেও আমি ধানের শীষকে , তারেক রহমানের ৩১ দফাসহ নির্বাচনী গণসংযোগ করছি। এখানে কষ্ট হলেও আসন বড় হওয়ায় আমি বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে বিএনপির বার্তা পৌঁছে দিচ্ছি, এতে ভালো লাগছে। আমি এমপি হলে, চেষ্টা করবো এখানকার অনেক অবহেলিত মানুষের ভাগ্যান্নয়নে কাজ করতে।’

কমিশন বলছে, সীমানা বড় হওয়া ও নতুন ভোটার বৃদ্ধিসহ এ বছর সিলেটে বেড়েছে সবচেয়ে বেশী ভোটার। সিলেট মহানগরীসহ ৪১টি উপজেলা, ৩৪০টি ইউনিয়ন ও ১৯টি পৌরসভা মিলিয়ে মোট ভোটার দাঁড়িয়েছে ৯১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৬ জন। বিভাগের চার জেলার মধ্যে সিলেট জেলায় ভোটার ৩১ লাখ ১৩ হাজার ৩৯৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৯৭০ জন, মহিলা ১৪ লাখ ৮৮ হাজার ৪০৮ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১৮ জন।

সিলেট বিভাগীয় নির্বাচন অফিসের আঞ্চলিক কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীন বলেন,‘ মূলত, গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসব আসনের সীমানা পরিবর্তন হয়েছিল। নতুন করে আমরা কোনো আসনের নির্বাচনী এলাকার সীমানা পরিবর্তন করিনি। ওই সময়ে কিছু উপজেলা যুক্ত হয়েছিল, কোনো উপজেলা বাদ পড়েছিল। আসন যত ছোট-বড়ই হোক, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দায়িত্বে প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করে নির্বাচনের পরিবেশ মনিটরিং করা হচ্ছে।’


 

বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন