গেরুয়া-ঝড়ে তছনছ হয়ে গেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়ের তৃণমূল কংগ্রেসের দেড় দশকের সাজানো বাগান। সোমবার রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা ও ফল ঘোষণা হয়। তাতে দেখা গেছে, তৃণমূলের ‘দিদি’র শাসনের অবসান ঘটছে এই রাজ্যে, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) প্রথমবারের মতো গড়তে যাচ্ছে সরকার।
গতকাল সন্ধ্যায় দিল্লিতে বিজেপির সদর দপ্তরে দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে! আজ থেকে বাংলা ভয়মুক্ত হলো। ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জনগণের শক্তির জয় হয়েছে এবং বিজেপির সুশাসনের রাজনীতি জয়ী হয়েছে।’
আর ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা অমিত শাহ বলেছেন, ‘বাংলার মানুষ অনুপ্রবেশকারী ও তাদের স্বার্থরক্ষাকারীদের শিক্ষা দিয়েেেছ।’ এক এক্স বার্তায় তিনি বলেন, বাংলার মানুষ অনুপ্রবেশকারী ও তাদের স্বার্থরক্ষাকারীদের এমন শিক্ষা দিয়েছে, যা তোষণের রাজনীতি করা দলগুলো কোনো দিন ভুলতে পারবে না। বাংলা যে আশা ও আকাক্সক্ষা নিয়ে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বের ওপর এ বিশ্বাস রেখেছে, বিজেপি অবশ্যই তা পূরণ করবে।’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যয় ১শরও বেশি আসন লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিজেপি একশরও বেশি আসন লুট করেছে। নির্বাচন কমিশন বিজেপির কমিশন। আমি সিইও মনোজ আগারওয়ালের কাছে অভিযোগ করেছি। কিন্তু তারা কিছুই করছে না।’ মমতা বিজেপির জয়কে ‘অনৈতিক বিজয়’ বলে উল্লেখ করে বলেন, টিএমসি ঘুরে দাঁড়াবে।
গতকাল আরও চারটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা ও ফল ঘোষণা করা হয়। দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সুপারস্টার থালাপতি বিজয় নতুন দল গড়ে রাজনীতিতে নেমেই বাজিমাত করেছেন। তামিলনাড়– বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতেছে। ক্ষমতাসীন ডিএমকের শক্ত ঘাঁটি কোলাথুরে প্রায় সাড়ে আট হাজার ভোটে হেরে গেছে মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিন। বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ ভারতের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, তামিলনাড়–তে টিভিকে ১০৬টি আসনে জয়ী হয়েছে এবং ০১টি আসনে এগিয়ে আছে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ডিএমকে। তারা ৫৯টি আসনে জয়ী হয়েছে এবং ১টি আসনে এগিয়ে আছে। কেরালায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) ৮৯টি আসনে জয়ী হয়েছে। সিপিআই (এম) পেয়েছে ২৬টি আসন। আসাম ও পদুচেরিতে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ যথাক্রমে ১০২ আসনে ও ১৮ আসনে জয় পেয়েছে।
ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ পাওয়া তথ্যানুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ২০২টি আসনে জয়ী হয়েছে এবং ৪টি আসনে এগিয়ে আছে। আর তৃণমূল কংগ্রেস ৭১টি আসনে জয় পেয়েছে এবং ১০টি আসনে এগিয়ে আছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের গণনা গতকাল সকাল ৮টায় শুরু হয়। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোটগ্রহণ হয়। প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে এবং দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়। তাতে রেকর্ড ৯০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পড়ে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতায় একটি কেন্দ্রের ভোট বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। ওই কেন্দ্রে ফের ভোট হবে ২১ মে। ফলে গতকাল ২৯৩ আসনের ফল প্রকাশ করার কথা। তাই সরকার গঠন করতে হলে একটি দলকে ওই ২৯৩ আসনের মধ্যে কমপক্ষে ১৪৭টি আসন পেতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘বাংলার সব হিন্দু আজ একজোট হয়েছেন। তারা নরেন্দ্র মোদির উন্নয়নের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিজেপি নিশ্চিতভাবেই বাংলায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গড়তে চলেছে।’
ভবানীপুরে শুভেন্দুর কাছে হেরেছেন মমতা: মমতা তার নিজ আসন ভবানিপুরে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটের ব্যবধানে হেরে গেছেন। এবার একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মমতা। হেরে যাওয়ায় এবার বিধানসভায় যাওয়া হচ্ছে না তার।
পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যাদের নাম : রাজ্য বিজেপির নেতাকর্মীরা বিজয় উদযাপন শুরু করে দিয়েছেন। বিজেপি সরকার গঠন করলে কে হতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী, সে আলোচনাও শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচনের আগে বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার জোর দিয়ে বলেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একজন বাঙালিই হবেন। সে হিসাবেই ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সম্ভাব্য কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছে। তারা হলেন বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, রাজ্য বিজেপির সাবেক সভাপতি দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার, সাবেক সাংবাদিক ও রাজ্যসভার সাবেক সংসদ সদস্য স্বপন দাশগুপ্ত প্রমুখ।
ওয়েট অ্যান্ড সি, আমরাই জিতব : ভোট গণনায় বড় হারের আভাসের মধ্যে গতকাল দুপুরে ফেসবুকে জরুরি ভিডিওবার্তায় হাজির হন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করে বলেন, প্রাথমিক গণনায় বিজেপিকে এগিয়ে থাকতে দেখা গেলেও সেটি আসলে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘চাল’। শেষ পর্যন্ত তৃণমূলই জিতবে বলে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
মমতা বলেন, ‘প্লিজ দয়া করে কেউ কাউন্টিং এজেন্ট, কাউন্টিং এজেন্টরা এবং প্রার্থী, ক্যান্ডিডেটরা, তারা কাউন্টিং এলাকা ছেড়ে আসবেন না। স্ট্রং রুমে যেখানে কাউন্টিং হচ্ছে, মানে সেন্টারে, সেখান ছেড়ে কেউ আসবেন না। এটা বিজেপির প্ল্যান।
‘সুতরাং আমি সব আমাদের কাউন্টিং এজেন্টদের, আমাদের সব পার্টির কর্মীদের বলব অত মন খারাপ করার কারণ নেই। আমি বলেছিলাম সূর্যাস্তের পর আপনারা জিতবেন। তিন রাউন্ড, চার রাউন্ড কাউন্ট হলেও এটা ১৪ রাউন্ড থেকে ১৮ রাউন্ড কাউন্ট হয়। তখন আপনারা জিতবেন। ওয়েট অ্যান্ড সি। ওয়াচ। আমরা সবাই আপনাদের সঙ্গে আছি। আপনারা কেউ ভয় পাবেন না। নিশ্চিন্তে থাকুন। আমরা বাঘের বাচ্চার মতো লড়াই করে যাব।’
নরেন্দ্র মোদির বার্তা : গতকাল সন্ধ্যায় দিল্লিতে বিজেপির সদর দপ্তরে দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন মোদি। এদিন ধুতি-পাঞ্জাবি পরে মঞ্চে উঠেন মোদি। পশ্চিমবঙ্গে অভাবনীয় জয়ে দলের কোটি কোটি কর্মীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলায় পরিবর্তন হয়ে গেছে। আজ থেকে বাংলা ভয়মুক্ত হলো। গণতন্ত্রে জয়-পরাজয় স্বাভাবিক। এটা গণতন্ত্রের জয়, সংবিধানের জয়।’
পশ্চিমবঙ্গে ৯৩ শতাংশ ভোটদানের হারকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর সর্বত্র পদ্ম ফুটেছে।’ প্রধানমন্ত্রী জানান, বিহারে ভোটের ফলের দিনই তিনি বলেছিলেন যে, গঙ্গা বিহার হয়ে গঙ্গাসাগরে যায়। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আত্মা শান্তি পেল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে দুপুরে এক্স হ্যান্ডেলে একটি বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি লেখেন ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে! ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জনগণের শক্তির জয় হয়েছে এবং বিজেপির সুশাসনের রাজনীতি জয়ী হয়েছে।’ তিনি আরও লেখেন ‘আমি পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রণাম জানাই। জনগণ বিজেপিকে এক অভূতপূর্ব রায় দিয়েছেন এবং আমি তাদের আশ্বাস দিচ্ছি যে, আমাদের দল পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করবে। আমরা এমন একটি সরকার দেব, যা সমাজের সব স্তরের মানুষের সুযোগ ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে।’
সারাবিশ্ব থেকে আরো পড়ুন