বিকেল গড়াতেই দক্ষিণ সুরমার একটি সরু গলিতে ভিড় জমতে শুরু করে। রিকশাচালক, দিনমজুর, কিশোর সবাই এসে দাঁড়ান একটি ছোট্ট টেবিলের সামনে। তাদের হাতে মাত্র দশ টাকা। আর চোখে আটশ টাকার স্বপ্ন। এটি কোনো বাজার নয়, কোনো হাট নয়; এটি সিলেটের একটি অনলাইন জুয়ার আসরের স্পটের দৃশ্য। আর এই স্পটগুলোই এখন সিলেটের অলিগলিতে গরিব মানুষের সর্বনাশের নতুন ঠিকানা।
১০ টাকায় ৮০০ টাকা এই এক কথায় ভরসা তাদের। নাইট তীর, তীর লাইভ, নাইট ইন্ডিয়া তীর কিংবা শিলং তীরÑ এসব নামের আড়ালে চলছে সংগঠিত জুয়ার কাজ-কারবার। বিকেল তিনটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত চলে টোকেন বিক্রি। এজেন্টরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা নেন, তারপর সেই টাকা পাঠিয়ে দেন অনলাইনে আন্ডারগ্রাউন্ডে বসে থাকা মূল জুয়াড়ির কাছে।
খেলার মাঝে মাঝে ইচ্ছাকৃতভাবে দু-একজনকে জেতানো হয়। এ খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে Ñ “অমুক ১০ টাকায় ৮০০ পেয়েছে।” এরপর আর পেছন ফিরে তাকানোর সুযোগ থাকে না সাধারণ মানুষের। সারাদিনের উপার্জনের শেষ টাকাটিও চলে যায় টোকেনের পেছনে।
জানা গেছে, ১০ টাকার বিনিময়ে মাঝে মধ্যে একজনকে ৮শ’ টাকা পাওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। রিকশা শ্রমিক, দিনমজুর, তরুণ শিক্ষার্থী সবাই এই লোভে পড়ে টোকেন কাটে। কেউ সারাদিনের উপার্জন খোয়ায়, কেউ ধার করে বাজি ধরে। আর এতে শ্রমজীবী মানুষের ঘাম, তরুণদের স্বপ্ন, পরিবারের শান্তি; সবকিছুই এই প্রলোভনের আগুনে ছাই হচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নীরবতা এই জুয়ার ফাঁদ ছড়িয়ে পড়ছে শহর জুড়ে। মাঝে মধ্যে র্যাব অভিযান চালালেও এর স্থায়ী সমাধান মিলছে না।
অনুসন্ধানে নগরজুড়ে শতাধিক আস্তানার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সিলেট নগরীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে প্রায় শতাধিক জুয়ার স্পট। কাজিরবাজার কাঁঠালবাজার থেকে শুরু করে শেখঘাট বেতের বাজার, কানিশাইল খেয়াঘাট, শামিমাবাদ, বাগবাড়ি ব্রিজের মুখ, মেডিকেল আল মনসুরের গলি, রিকাবিবাজার ফুলকলি গলি, তালতলা নন্দিতা সিনেমা হলের গলি, কালিঘাট বাজারের গলি, সোবহানিঘাট পুলিশ ফাঁড়ির গলি থেকে শুরু করে সোবহানিঘাট ট্রেড মার্কেটের সবজি গলি পর্যন্ত সর্বত্র জুয়ার আসর।
দক্ষিণ সুরমার রেলগেট, কদমতলী বাস টার্মিনাল, বালুর মাঠ এলাকায়ও একই চিত্র। একটি টেবিল, কিছু কাগজ আর একজন এজেন্টÑ এটুকুই যথেষ্ট এই অবৈধ কারবার চালাতে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে প্রশ্নটি উঠে আসছে তা হলো এভাবে প্রকাশ্যে চললেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রহস্যজনক নীরবতা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, থানা ও ফাঁড়ি পুলিশ সাপ্তাহিক চাঁদার বিনিময়ে এসব স্পট চালু রাখতে মদদ দিচ্ছে। ডিবি পুলিশের টহল দলও নাকি নিয়মিত মাসোহারা পায়। ফলে অভিযান তো দূরের কথা, টহলেও এই গলিগুলোর দিকে চোখ এড়িয়ে চলে।
দক্ষিণ সুরমার বাবনা সাধুরবাজারে স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ি ও ডিবির টহলদলকে “ম্যানেজ” করে একজন এজেন্ট প্রকাশ্যে জুয়ার স্পট চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। প্রতিদিন লক্ষ টাকার কমিশন পকেটে যাচ্ছে তার, আর পথে বসছেন বরইকান্দি, মোল্লারগাঁও, লাউয়াই পিরোজপুরের রিকশাচালক ও দিনমজুরেরা।
থানা পুলিশ যেখানে নিস্ক্রিয়, সেখানে র্যাব-৯ অন্তত মাঠে নেমেছে। সম্প্রতি বুধবার রাতে নগরীর কাস্টঘর সুইপার কলোনিতে অভিযান চালিয়ে ৬ জনকে আটক করা হয়েছে। জব্দ হয়েছে একটি স্মার্টফোন, ১৭৭টি টালি খাতা ও ৪টি জুয়ার বোর্ড।
আটককৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে ১০ টাকায় ৮০০ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে টেনে এনে কমিশন পেতেন তারা।
র্যাব-৯-এর মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ জানান, গোয়েন্দা নজরদারি ও আটক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই জুয়ার শিকড় আসলে আরও গভীরে। জুয়ার বোর্ডগুলো পরিচালিত হচ্ছে দেশের বাইরে থেকে। স্থানীয় এজেন্টরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে বিকাশসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিচ্ছেন বিদেশে থাকা মূল হোতাদের কাছে। অর্থাৎ, দিনমজুরের ঘামে ভেজা টাকা পাড়ি দিচ্ছে দেশের সীমানা পেরিয়ে।
এ ব্যাপারে এসএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. মঞ্জুরুল আলম বলেছেন, থানা পুলিশকে অভিযান চালাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বিশেষ শাখা আস্তানাগুলো সনাক্তের কাজ করছে। শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানান তিনি।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন এতদিন ধরে এত প্রকাশ্যে চলার প
রেও “শিগগির” ক্ষণটি কবে আসবে?
বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন