সিলেট

এবার কৃষিজমিতে বালুচক্রের থাবা

৭ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত সরকার 

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ ১৪:৫৬

শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি ছড়া ও নিকটবর্তী নদী থেকে অবাধে উত্তোলন করা হচ্ছে বালু। ছবি: সংগৃহীত

বালুচক্রের থাবা থেকে বাদ পড়ছে না পাহাড়ি ছড়া-নদী আর কৃষিজমি। সমতলের নদী-খালের বুক ছিঁড়তে বসেছে বালু চক্রটি। মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি ছড়ার দিকেই তাদের নজর। দুর্গম পাহাড়ি টিলা থেকে নেমে আসা ছড়া ও নদী এবং কৃষিজমি থেকে অবাধে উত্তোলন করা হচ্ছে বালু। 


প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান, মামলা ও জরিমানার পরও থামছে না বালু খেকোচক্রের লুটপাট। এতে একদিকে সরকার বছরে অন্তত ৬ থেকে ৭ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে অতিমাত্রার ভূমিকম্প প্রবণ এই এলাকার প্রতিবেশ ও প্রকৃতি ধ্বংসের সুযোগ নেই। পরিবেশ, কৃষিজমি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও জননিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। 
সর্বশেষ চার দিনের অভিযানে উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ১০ হাজার ঘনফুট অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ সময় বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত তিনটি মেশিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। 


উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহিবুল্লাহ আকনের নেতৃত্বে শনিবার এক হাজার ৫০০ ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়েছে। এর আগে গত মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ভূনবীর ইউনিয়নের তিনটি স্থানে অভিযান চালিয়ে জব্দ করা হয় আরও ছয় হাজার ঘনফুট বালু। একই সময়ে ভূনবীর থেকে আরও দুই হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়। 


প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধিত ২০২৩) অনুযায়ী পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১০ জনকে মোট ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সিন্দুরখান, ভূনবীর, মতিগঞ্জ, কালাপুরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৫টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে একাধিক এক্সক্যাভেটর (ভেকু) মেশিন জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে এবং প্রায় ৩০ হাজার ঘনফুট অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু জব্দ ও বিনষ্ট করা হয়েছে। 


বালুকে কেন্দ্র করে বাড়ছে সংঘাত:
অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘর্ষ, হামলা, সড়ক দুর্ঘটনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। সম্প্রতি একটি বালুবাহী ডায়না গাড়ির চাপায় ছয়জন আহত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় জনতা গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং শ্রীমঙ্গল-মির্জাপুর সড়ক অবরোধ করে। 


শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানের সময় একটি বালুবাহী ডায়না গাড়ি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি ব্যাটারিচালিত টমটমকে চাপা দেয়। এতে চালকসহ ছয়জন আহত হন। আহতরা হলেন- শিপন মিয়া, রাসেল, গিয়াস মিয়া, রুবেল মিয়া, জাকির মিয়া ও মারজান আহমেদ। 
ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা ডায়নার গাড়িটি ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং সড়কে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। ফলে প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ ঘটনায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরাও হামলার শিকার হন। 


২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা:
গত ২ মে ভূনবীর ও মির্জাপুর এলাকায় পরিবেশ ধ্বংস করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি করেন ভূনবীর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিমেল পাল। মামলার আসামিরা হলেন- ফেরদৌস মিয়া, আহাদ মিয়া, কাওছার মিয়া, উজ্জ্বল মিয়া, ফয়েজ মিয়া, মোচ্ছাব্বির মিয়া, মাসুক মিয়া, লোকমান মিয়া, মো. আব্দুল্লাহ, মকবুল মিয়া, কদর আলী, নানু মিয়া, দুদু মিয়া, সামছু মিয়া, বেলাল মিয়া, আছলাম মিয়া, কবির মোল্লা, লতিফ মিয়া ও আজাদ মিয়া। তাদের অধিকাংশের বাড়ি ভূনবীর ও মির্জাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে। 
মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। এখন এটি চলবে না। 
মামলায় বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলা সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি ছড়া ও কৃষিজমি সংলগ্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছিল। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমি, বসতভিটা ও স্থানীয় অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়ছে। 


৩০টির বেশি পাহাড়ি ছড়া ঝুঁকিতে:
শ্রীমঙ্গলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৩০টিরও বেশি পাহাড়ি ছড়া হাইল হাওরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বর্মাছড়া, উদনাছড়া, হরিণছড়া, পুটিয়াছড়া, বিলাশছড়া, ফুলছড়া, কাকিয়াছড়া, আমরাইলছড়া, ইছামতিছড়া, ভুড়ভুড়িয়া ছড়া, জাগছড়া, সুনাছড়া, নারাইনছড়া, বৌলাছড়া, গিলাছড়া, শিয়ালছড়া, খাইছড়া ও শাখামোড়া ছড়া। 


জানা গেছে, সিন্দুরখান ইউনিয়নের লাংলিয়া ছড়া, সিন্দুরখান চা বাগান, কুঞ্জবন, কামারগাঁও ও চিরিগাঁও এলাকায় একাধিক পয়েন্ট থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। একই ইউনিয়নের মটুলির পাড় এলাকায় বিটন কুর্মীর বাড়ি পাশে একটি চক্র পুটিয়া ছড়া থেকে বালু উত্তোলন করে। 


আশিদ্রোন ইউনিয়নের বিলাশ নদীর পাড়ের টং, আশিদ্রোন ও জামসী এলাকা, সাতগাঁও ইউনিয়নের মাকরী ছড়া, গান্ধিছড়া ও ইছামতিছড়া, ভূনবীর ইউনিয়নের জয়িতাছড়া এবং মির্জাপুর ইউনিয়নের বড়ছড়া ও বৌলাছড়াসহ বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। কালাপুর ইউনিয়নের শিয়ালছড়া, নারাইনছড়া ও জাগছড়ার একাধিক স্থান থেকেও নিয়মিত বালু উত্তোলন হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এ ছাড়াও শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন, কালিঘাট ও রাজঘাট ইউনিয়নেরও বেশ কিছু জায়গা থেকে ছোট ছোট পরিসরে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। 
 

সিলেট থেকে আরো পড়ুন