প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২২:৫৩
ছবি: সিলেটের মানচিত্র
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। তবে নতুন বদলি নীতিমালার কয়েকটি শর্ত নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে শিক্ষকদের মধ্যে। বিশেষ করে কোনো বিদ্যালয়ে পাঁচজন শিক্ষক কর্মরত থাকলে সেখান থেকে শিক্ষক বদলি না করা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:৪০-এর বেশি হলে বদলির সুযোগ না দেওয়ার বিধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষকরা।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বে গঠিত কমিটির মাধ্যমে এবারের বদলি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তবে নীতিমালার এসব শর্তের কারণে অনেক শিক্ষক ন্যায্য বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষকদের দাবি, দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে যেখানে পাঁচজন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া সরকারের একটি প্রকল্পের আওতায় প্রতিষ্ঠিত প্রায় ১ হাজার ৫০০ বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদের সংখ্যা পাঁচটি করে নির্ধারিত। ফলে এসব বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকরা ‘পাঁচজন শিক্ষক থাকলে বদলি নয়’—এমন শর্তের কারণে দীর্ঘদিন বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
অন্যদিকে, বিদ্যালয়ভেদে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংখ্যায় রয়েছে বড় ধরনের বৈষম্য। কোথাও শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭০ জনেরও কম, অথচ শিক্ষক রয়েছেন তুলনামূলক বেশি। আবার কোনো কোনো বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭০ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত। এতে একদিকে কম শিক্ষার্থী থাকা বিদ্যালয়ে শিক্ষক-সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না, অন্যদিকে শিক্ষার্থী বেশি থাকা বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অতিরিক্ত চাপ নিয়ে পাঠদান করছেন।
শিক্ষকদের মতে, এই বৈষম্য দূর করার কার্যকর উপায় হতে পারে ‘সমন্বিত বদলি’ ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী কম থাকা বিদ্যালয় থেকে অতিরিক্ত শিক্ষককে শিক্ষক সংকটে থাকা বিদ্যালয়ে পদায়ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু বর্তমানে এ ধরনের সমন্বিত বদলি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নতুন নীতিমালাতেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় শিক্ষকরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহর তরফদার বলেন, বিষয়টি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। সমন্বিত বদলি চালু করা গেলে একদিকে শিক্ষক সংকট কমবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও এর সুফল পাবে।
শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহেদা শারমিন জুলি বলেন, তাদের বিদ্যালয়ে ২৮৪ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র চারজন। ফলে প্রত্যেক শিক্ষককে ৭০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। সমন্বিত বদলি চালু হলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংখ্যার মধ্যে ভারসাম্য আনা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
শিক্ষক সমিতির নেতা জাকির হোসেন বলেন, শ্রীমঙ্গল চা বাগানসহ বিভিন্ন এলাকার বেশ কিছু বিদ্যালয়ে পাঁচজন করে শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। আবার কয়েকটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় সহকারী শিক্ষকরাও বদলির সুযোগ পাচ্ছেন না।
তার মতে, পাঁচজন শিক্ষক থাকা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:২০-এর নিচে থাকা বিদ্যালয় থেকে অন্তত একজন সহকারী শিক্ষককে বদলির সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। অথবা ১:৪০ অনুপাত বজায় রেখে শিক্ষক বদলির বিধান রাখা হলে পরিস্থিতি আরও বাস্তবসম্মত হবে।
শ্রীমঙ্গলের খেজুরিছড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমা রানী দেব জানান, তার বিদ্যালয়ে ৪০৬ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে পাঠদান করতে তাদের প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে। বিদ্যালয়ে আরও শিক্ষক প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কয়েকজন শিক্ষকের কাছ থেকে এ ধরনের অভিযোগ মৌখিকভাবে পাওয়া গেছে। বিষয়টি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে জানানো হয়েছে। তবে বদলির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে উপজেলা পর্যায়ের বদলি-সংক্রান্ত কমিটি।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহিনা ফেরদৌসী বলেন, পাঁচজন শিক্ষক থাকা বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপনের বিধান রয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায়ের বদলি কমিটিরও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় থেকে নেওয়া হয় এবং অধিদপ্তর তা বাস্তবায়ন করে। যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বেশি কিন্তু শিক্ষক পদ কম, সেসব বিদ্যালয় নিয়ে শিগগিরই একটি জরিপ করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি মন্ত্রণালয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে।
তিনি আরও জানান, শিগগিরই প্রায় ১৪ হাজার সহকারী শিক্ষককে পদায়ন করা হবে। এতে শিক্ষক সংকটের বড় একটি অংশের সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে শিক্ষকরা বলছেন, স্থানীয় বদলি কমিটির হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকলেও নীতিমালায় বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এতে একই পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমবে এবং বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত হবে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, শিক্ষকদের বদলির অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ভেদে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বৈষম্য দূর করতে দ্রুত সমন্বিত বদলি ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা হবে। এতে যেমন শিক্ষকরা ন্যায্য বদলির সুযোগ পাবেন, তেমনি শিক্ষক সংকটে থাকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও পাবে প্রয়োজনীয় শিক্ষক।
সি/মা/ডেস্ক/এসসিজে
শিক্ষা থেকে আরো পড়ুন