বিশেষ প্রতিবেদন

হারিয়ে যাচ্ছে মাটির তৈরি সুস্বাদু 'ছিকর'

লোকসংস্কৃতির বিলুপ্ত অধ্যায়

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫:৫৬

আগে বাজারে গেলে এক টাকা দিয়া ছিকর আনতাম আমার ঘরের লাগি। বাজারের হকল দোকানে ছিকর পাইতাম। এখন আর ছিকর দেখি না—আলোচ্য আক্ষেপটি ৮০ বছর বয়সী তারিফ উল্লার। কয়েক দশক আগেও সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের হাট-বাজারে মাটির তৈরি ‘ছিকর’ ছিল একটি পরিচিত ও লোভনীয় খাবার।

একসময় মাত্র এক টাকায় পাওয়া যেত এটি। ঘরের নারী, শিশু ও নববধূদের জন্য মানুষ বাজার থেকে ছিকর কিনে বাড়ি ফিরতেন। এমনকি অনেক সময় এক ফট চালের বিনিময়েও মিলত এই খাবার।

দিরাই উপজেলার গ্রামীণ জনপদে একসময় ছিকরের বেশ কদর ছিল। সাধারণ দোকানের পাশাপাশি ফেরিওয়ালারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ছিকর বিক্রি করতেন। তাঁদের ফেরি করার হাঁক শুনে বাড়ির নারী-শিশুরা ছুটে আসতেন।

৬৫ বছর বয়সী সখিনা বিবি জানান, ছিকর তাঁদের খুব পছন্দের জিনিস ছিল। বাজার থেকে আনিয়ে তাঁরা খেতেন এবং ফেরিওয়ালারা বাড়ি বাড়ি এলে চালের বিনিময়েও তা সংগ্রহ করে রাখতেন। ৫২ বছর বয়সী মনিরা বেগমও ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করে বলেন, আগে বাজারে সহজেই ছিকর পাওয়া গেলেও এখন অনেক দিন ধরে আর তা চোখে পড়ে না।

দিরাই পৌরসভার মধ্যবাজারের ব্যবসায়ী বিনয় লালা প্রায় ৪০ বছর ধরে ছিকর ও চুন বিক্রি করছেন। তাঁর চোখের সামনেই কমেছে ছিকরের চাহিদা। তিনি জানান, চার দশক ধরে এই ব্যবসা করলেও একসময়ের প্রচুর বিক্রির সেই দিনগুলো আর নেই। এখন এগুলো কেউ খায় না বললেই চলে, নতুন প্রজন্ম তো ছিকর চিনেই না। বর্তমানে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেও সারাদিনে এক কেজিও বিক্রি হয় না, উপরন্তু ছিকর সংগ্রহ করাও এখন অনেক কষ্টের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মিত্রা পুরকায়স্থ বলেন, ছোটবেলায় নিয়মিত ছিকর খেতেন এবং সেসময় গর্ভবতী মহিলারাও এটি খেতেন।

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিহি এঁটেল মাটি সংগ্রহ করে পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাত করার পর ছোট ছোট টুকরো বা বিস্কুটের মতো আকার দেওয়া হতো। পরে রোদে শুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে তৈরি করা হতো ছিকর। পোড়ানোর পর এর রং হতো লালচে বা কালচে। ঐতিহ্যগতভাবে কোথাও কোথাও এর সাথে গোলাপজল, আদার রস ও সামান্য চিনি ব্যবহারের প্রচলনও ছিল।

আধুনিক খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, প্যাকেটজাত খাবারের বিস্তার, ছিকর তৈরির কারিগর কমে যাওয়া এবং কাঁচামাল সংগ্রহের জটিলতায় মূলত সংকুচিত হয়েছে এর বাজার। একসময় যে ছিকর বাজারের প্রায় দোকানে পাওয়া যেত, তা এখন হাতে গোনা এক বা দুটি দোকানে ঠাঁয় পেয়েছে।

প্রবীণদের স্মৃতিতে ছিকর কেবল একটি খাবার নয়; এটি হাটের দিন, ফেরিওয়ালার হাঁক আর গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো নস্টালজিয়া। একসময়ের এক টাকার ছিকর আজ ২০০ টাকা কেজি হলেও ক্রেতার আভিজাত্য বা আগ্রহে টান পড়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে অচেনা হয়ে পড়া এই খাবারের হাত ধরেই হারিয়ে যাচ্ছে দিরাইয়ের লোকজ খাদ্যসংস্কৃতির একটি সুপ্রাচীন অধ্যায়।

উল্লেখ্য, ছিকর হচ্ছে এঁটেল মাটি দিয়ে তৈরি লাল ও কালচে রঙের এক প্রকার পোড়ামাটির বিস্কুট যা সিলেটের বেশ কিছু অঞ্চলে জনপ্রিয় ছিল। হবিগঞ্জে প্রথম ছিকর তৈরির প্রচলন হলেও পরবর্তীতে তা দেশের বিভিন্ন এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ছিকরে খাই মাখানোর সময় গোলাপজল, আদার রস ইত্যাদি মেশানোর কারণে এলাকাভেদে এর স্বাদেরও তারতম্য হয়। একসময় ধারণা করা হতো, গর্ভবতী নারীদের ছিকর খাওয়ালে পেটের বাচ্চা সুস্থ থাকবে। আগুনের ধোঁয়ায় তৈরি ছিকর কোনোটি দেখতে বিস্কুটের মতো আবার কোনোটি ললিপপের মতো লম্বা ছিল। ডুকলা নামে পরিচিত মৌলভীবাজারে পাহাড়ি এলাকার হিন্দু সম্পদায়ের নারীরা এসব ছিকর তৈরি করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করত

 

বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন