ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস জোটের সম্মেলনে স্বাগতিক ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি ঘোষণাটি প্রকাশ করেছেন। গতকাল শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ঘোষণায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে (ইউএনএসসি) ‘কাঠামোগত পরিবর্তন’সহ বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এতে সন্ত্রাসবাদেরও তীব্র নিন্দা করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘একতরফা যুদ্ধের পদক্ষেপের’ নিন্দা জানিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক আগ্রাসনের মধ্যে সমুদ্রপথে বাণিজ্য ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সম্মেলনে উপস্থিত নিরাপত্তা পরিষদের দুই স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া জাতিসংঘে, বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদে, আরো বড় ভূমিকা পালনে ব্রাজিল ও ভারতের আকাঙ্ক্ষার প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। ঘোষণায় বলা হয়েছে, ব্রিকসের আন্তবাণিজ্য ক্রমবর্ধমানভাবে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে স্থানীয় মুদ্রায় পরিচালিত হওয়া উচিত।
ঘোষণায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারেরও নির্দিষ্ট আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর আরো বেশি প্রতিনিধিত্বের কথা বলা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আজকের আলোচনায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে পরিবর্তনশীল বিশ্বকে পুরনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব নয়; প্রতিনিধিত্ব, কার্যকারিতা ও নিয়ম তৈরির ক্ষেত্রে সংস্কার জরুরি।’ তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতের প্রযুক্তি এবং সেগুলো পরিচালনার নিয়ম তৈরিতে গ্লোবাল সাউথের সমান অংশগ্রহণ থাকা উচিত—এ বিষয়েও আমরা গুরুত্ব দিয়েছি।’
ব্রিকস প্রতিষ্ঠার দুই দশক পূর্ণ হওয়ার সময় এবং জোটটি মূল সদস্যদের বাইরে সম্প্রসারিত হওয়ার পর এই ঘোষণা দেওয়া হলো।
ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে একটি সংকটপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ডব্লিউটিওর নিয়মের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বাণিজ্য-নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের বিস্তার—যেমন নির্বিচারে শুল্ক ও অশুল্ক ব্যবস্থা বাড়ানো কিংবা পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনের নামে সুরক্ষাবাদী নীতি গ্রহণ—বিশ্ববাণিজ্য আরো কমিয়ে দিতে, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করতে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। এতে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য আরো বাড়তে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘একতরফাভাবে শুল্ক ও অশুল্ক ব্যবস্থা বাড়ানোর ঘটনায় আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।
এসব পদক্ষেপ বাণিজ্যকে বিকৃত করে এবং ডাব্লিউটিওর নিয়মের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। বাণিজ্যে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন এবং উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের বিষয়ে ডাব্লিউটিওর কার্যকারিতা বাড়াতে আমরা একসঙ্গে কাজ করব। পাশাপাশি বাকি থাকা বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং ভারসাম্যপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে সমর্থন দেওয়া হবে, যা বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরো কার্যকর করবে।’
ঘোষণায় ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে সন্ত্রাসী হামলারও নিন্দা জানানো হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির তথ্য অনুযায়ী, ঘোষণায় কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করেই ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা জানানো হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এমন অবস্থানকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এবারের ব্রিকস সম্মেলনে যৌথ ঘোষণা নিয়ে ঐকমত্যের বিষয়টি নিশ্চিত করে এনডিটিভি জানিয়েছে, স্থানীয় সময় শনিবার বিকেল ৪টায় ‘ব্রিকস নয়াদিল্লি ঘোষণা’ প্রকাশ করা হয়।
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ভারতের ঘনিষ্ঠ দুই মিত্র ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতপার্থক্যই আগে যৌথ ঘোষণা আটকে থাকার প্রধান কারণ ছিল। চলতি বছরের মে মাসে নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও ইরান ও ইউএইর মতবিরোধের কারণে যৌথ ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু এবার সদস্য দেশগুলোকে রাজি করাতে পারাকে ভারতের কূটনৈতিক সক্ষমতার বড় উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একাধিক নেতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন।
শির সঙ্গে বৈঠকে যে বার্তা দিলেন মোদি : দীর্ঘ সাত বছর পর ভারত সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং। শনিবার নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন দুই নেতা।
বৈঠকের শুরুতে মোদি শি চিনপিংকে স্বাগত জানিয়ে ব্রিকস সম্মেলনে তার ইতিবাচক বক্তব্য এবং ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্বে চীনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, এখন দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জবাবে শি চিনপিং বলেন, গত ১৫ জুন নিজের জন্মদিনে তিনি ভারত সফরের আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। গত কয়েক বছরে মোদির সঙ্গে তার ২১ বার বৈঠক হয়েছে এবং এসব বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ককে স্থিতিশীল উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্য হয়েছে।
চীনা প্রেসিডেন্ট বলেন, জাতীয় পরিস্থিতিতে পার্থক্য থাকলেও ভারত ও চীন পরস্পরের শক্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে একে অন্যকে সহযোগিতা করতে পারে এবং অভিন্ন উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে। সূত্র : এনডিটিভি ও রয়টার্স
সারাবিশ্ব থেকে আরো পড়ুন