নিকাহ নিবন্ধন, কাজী ও সাব-রেজিস্ট্রারের পদে বাণিজ্য
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:০৬
সিলেট জেলা রেজিস্ট্রার মো. জহুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। অফিসের কর্মচারীদের নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যার মাধ্যমে কাজী ও সাব-রেজিস্ট্রারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অনলাইন নিকাহ নিবন্ধনে প্রবাসী পরিবারগুলোকে হয়রানি করা হচ্ছে, আর অতিরিক্ত দায়িত্বের নামে কাজীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রতি বৃহস্পতিবার তিনি বিমানে ঢাকা হয়ে সৈয়দপুরে গ্রামের বাড়ি যান। সাপ্তাহিক বিমানভাড়া প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই বিমানভাড়া আসছে ঘুষের অর্থ থেকে। শুধু বিমানভাড়া নয়, অফিসের ব্যক্তিগত কক্ষের বিলাসবহুল সাজসজ্জা ও উপশহরের ভাড়া বাসার আসবাবপত্রও এসেছে ঘুষের টাকায়।
জহুরুল ইসলাম তার অফিসের কম্পিউটার অপারেটর আজিজ, কর্মচারী রাজন ও হামিদকে নিয়ে একটি ঘুষ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তাদের মাধ্যমে কাজীদের অডিট, অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান, এবং অনলাইন নিকাহ আবেদন অনুমোদনের নামে অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
আজিজ দীর্ঘদিন ধরে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে থেকে নানা দুর্নীতি করেছেন। বদলি হলেও আবার ঘুষের বিনিময়ে পুনর্বহাল হয়েছেন। রাজন ও হামিদ উপজেলা অফিসের উমেদার পদে থাকা সত্ত্বেও জেলা রেজিস্ট্রারের অফিসে এনে ঘুষ আদায়ের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সিলেট জেলার প্রায় আড়াই শ কাজীর নিকাহ ভলিয়ম অডিটের দায়িত্ব পালন করেন জেলা রেজিস্ট্রার। কিন্তু তিনি এই দায়িত্বকে ঘুষ বাণিজ্যে পরিণত করেছেন। বছরে দুবার অডিটের নামে প্রতিটি কাজীর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। এতে বছরে কয়েক লাখ টাকা ঘুষ সংগ্রহ করা হয়।
আইন অনুযায়ী, কোনো কাজীকে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া যায়। কিন্তু জহুরুল ইসলাম বছরের পর বছর একজন কাজীকে দুটি ওয়ার্ডে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে মাসিক ঘুষ বাণিজ্য করছেন।
কাজী আব্দুল জলিল খান প্রায় ১০ বছর ধরে দুই ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করছেন। কাজী মোজাম্মেল পাঁচ বছর ধরে অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন। কাজী আব্দুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত দায়িত্বে আছেন। প্রতিটি দায়িত্বের জন্য ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। পরে আবার ছয় মাস পর-পর আরও দুটি অডিটের নামেও তিনি ১০ হাজার করে হামিদ-রাজনকে দিয়ে ঘুষ নিচ্ছেন বলে কাজীরা অভিযোগ করেন। কাজীরা তার অধীনে চাকরি করায় জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
কাজী আসাব আলী স্বীকার করেছেন, তিনি আজিজ ও রাজনের মাধ্যমে ঘুষ দিয়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব পেয়েছেন। এ চিঠিতে জেলা রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। বিষয়টি ওপেন সিক্রেট হয়ে গেছে।
জহুরুল ইসলাম সাব-রেজিস্ট্রার পদেও ঘুষ বাণিজ্য করছেন। কোম্পানিগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রারকে গোয়াইনঘাটের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ওসমানীনগরের সাব-রেজিস্ট্রারকে তিনটি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গোলাপগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রারকে সদর পদে বসানো হয়েছে। প্রতিটি দায়িত্বের জন্য ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়।
প্রবাসী পরিবারের ভোগান্তি :
প্রবাসী পরিবারগুলো অনলাইনে নিকাহ আবেদন করলে তা মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। ঘুষ দিলে আবেদন দ্রুত অনুমোদন হয়, আর ঘুষ না দিলে সামান্য ভুলকে বড় করে দেখিয়ে আবেদন বাতিল করা হয়।
ঘুষের পরিমাণ ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। ঘুষ না দেওয়ায় প্রায় ৫ হাজার আবেদন আটকে আছে। ভুল বানান, বয়সজনিত সমস্যা, কাজীর উপস্থিতি না থাকায় এসব অজুহাতে আবেদন বাতিল করা হয়।
সিলেট জেলা বিএনপির নেতা আল আমিন রায়হান অভিযোগ করেন, তার ভাবীর নিকাহ আবেদন মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। ফলে আবেদন বাতিল হয়ে যায়। এতে প্রবাসী পরিবারগুলো মারাত্মক হয়রানির শিকার হচ্ছে।
জানতে চাইলে জেলা রেজিস্ট্রারের জহুরুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, কিছু আবেদন পেন্ডিং আছে। তবে তিনি দাবি করেন, এখন আর তেমন আবেদন আটকে নেই। বিমান ভ্রমণের খরচ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি ব্যক্তিগত বিষয়।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক কাজী আবদুল হান্নান জানিয়েছেন, অনলাইন নিকাহ আবেদন নিয়ে কোনো হয়রানি হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন