অব্যবস্থাপনা, অবহেলা আর আইন প্রয়োগের শিথিলতা
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ ১৯:৩১
সিলেটের তিন মহাসড়ক যেন মৃত্যুর অঘোষিত ফাঁদ। সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক, সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক আর সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রতিটি পথই যেন ভয়ংকর ফাঁদে পরিণত হয়েছে। অব্যবস্থাপনা, অবহেলা আর আইন প্রয়োগের শিথিলতায় প্রতিদিনের যাত্রা হয়ে উঠছে অনিশ্চিত। চার মাসে ৯৮টি প্রাণ নিভে গেছে এই সড়কে, আর মাত্র দুদিনে ১৫টি পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লোকজন লিখছে ক্ষোভ আর কান্নার কথা, চাইছে বিচার, জানাচ্ছেন সড়কে সতর্ক থাকার কথা।
গত ৩ মে সিলেটের তেলীবাজারে ডিআই ট্রাক ও কাঁঠাল বোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৯ জন। তারা সকলেই ছিলেন নির্মাণ শ্রমিক। আম্বরখানা থেকে ঠিকাদার তাদেরকে ওসমানীনগরের গোয়ালাবাজারে নিয়ে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তারা।
আহত শ্রমিকরা জানান, ডিআই ট্রাকের ভেতরে তারা গাদাগাদি করে বসেছিলেন। গাড়ির মাঝখানে ছিল ঢালাই কাজের মিক্সার মেশিন। যখন গাড়ি ব্রেক কষত তখন মনে হত গাড়ি এই বুঝি উল্টে গেছে। এভাবেই তারা পাড়ি দেন দূঘটনার আগ পর্যন্ত।
আরেক যাত্রী জানান, ট্রাক যখন উল্টে যায় তখন মিক্স্রার মেশিন আগে গড়িয়ে পড়ে। আর একারনেই অনেকে মারা যান। ওই যাত্রী জানান, তারা প্রায়ই এধরনের গাড়িতে করে ঢালাইর কাজে যান। ঠিকাদাররা তাদেরকে এমন গাড়িতে করে প্রায়ই নিয়ে যায় বলেও তিনি জানান।
পরদিন ৪ মে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে পৃথক দুঘটনায় প্রাণ হারান একই পরিবারের চারজন সহ ৬ জন। অসুস্থ বাবাকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে একটি বাস সিএনজি অটোরিকশাকে চাপা দিলে চালক সহ একই পরিবারের ৫ জন মারা যান। ছাতকের জালালপুরে ঘটে এই দুর্ঘটনা। একই সড়কের মদনপুরে মারা যান এক নারী।
এছাড়া রবিবার সিলেটের জৈন্তাপুরে ও হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে সড়ক দূর্ঘটনায় প্রাণ হারান দুই তরুণ। যেন সড়ক সিলেটবাসীর জন্য মৃত্যুর ফাদে পরিনত হয়েছে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিচসা) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে গেল জানুয়ারি মাসে সিলেটে ২৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৬ জন, মার্চে ৩২ জন এপ্রিলে ১৫ জন মানুষ মারা যান। আর মাত্র দুদিনের ব্যবধানে রোববার ও সোমবার মারা গেলেন ১৫ জন।
শেরপুর হাইওয়ে থানার ওসি আনিসুর রহমান বলেন, এখন সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে উন্নয়ন কাজ চলমান। এটা এখন প্রধান সমস্যা। এছাড়া ওই সড়কে রয়েছে অনেকগুলো বাঁক। কোন কোন এলাকায় আছে রাস্তা অনেকটা সরু।
দূর্ঘটনার অন্যতম আরও আকেটি কারন হচ্ছে চালকরা থাকেন অনেক সময় বিশ্রামহীন। দূরপাল্লার মালবোঝাই ট্রাক ও লরি চালকরা অনেক সময় বিশ্রাম নেওয়ার সময় পান না। তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে যান মালিকের ফোন পেয়ে। কারন তাকে সেখান থেকে একই যানবাহনে করে যেতে হবে অন্যস্থানে। এক্ষেত্রে মালিক পক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, তাদের হাতে মূল্যবান গাড়ি তুলে দেন। তিন্তু চালকের বিশ্রামের কথা তারা মাথায় রাখেন না। অনেক সময় চালক ও মালিককে না বলে টিপ রেখে দেন। কোন কোন সময় দেখা গেছে কোন কোন চালকেক এক নাগাড়ে ৫ রাত ঘুমিয়ে কাজ করতে। তারা সড়কের জামে নতুবা হেলপারের হাতে স্ট্রিয়ারিং তুলে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ফলে দূর্ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন,সচেতন না হলে করার কিছু নেই।
এ ব্যপারে নিরাপদ সড়ক চাই (নিচসা) সিলেট জেলার আহবায়ক জহিরুল ইসলাম মিশু বলেন, আমরা সড়ক নিরাপদে কাজ করতে গিয়ে অনেকটা হতাশ। প্রথমত; আমরা সচেতন নই। দ্বিতীয়ত; হল প্রশাসন উদাসীন। দেশে প্রতিদিন এত দুর্ঘটনা ঘটছে তারপরও আমরা মোটরসাইকেল চালাই হেলমেট ছাড়া। যে গাড়ির ভাড়া কম, খোজে খোজে সেটিতে উঠি। এটি থেকে বের হতে হবে। আর এটি করা না গেলে দুর্ঘটনা কোনভাবেই রোধ করা যাবে না।
তিনি বলেন, গত ৩ মে সিলেটে যে মমান্তিক ঘটনা ঘটেছে এর মৃত্যুর জন্য ডিআই ট্রাক অনেকাংশে দায়ি। এই ট্রাক দিয়ে মানুষ এবং মিক্সার মেশিন বহন করা হচ্ছিল। যেকারনে মৃতের সংখ্যা অনেকটা বেড়ে গেছে। এজন্য প্রশাসনের গাফিলতি আছে। যেহেতু এধরনের গাড়িতে মানুষ উঠানো নিষিদ্ধ সেখানে এসব গাড়ি দিয়ে দেদারছে চলছে মানুষ বহন। প্রতিদিনই চলছে এসব গাড়ি। এজন্য প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। প্রশাসন কঠোর না হলে কোনভাবেই দুর্ঘটনা রোধ করা যাবেনা। এছাড়া সড়কের বিভিণœস্থানে আছে ইঞ্জিনিয়ারিং ত্রুটি। এসব ত্রুটির কারনে বাড়ছে দুর্ঘটনা। এছাড়া সড়কে নিম্মমানের বিটুমিন ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব দূরীকরনে রোডস এন্ড হাইওয়েকে আমরা বলেছি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তাদের মধ্যে অনেকটা সমস্যা আছে। সব মিলিয়ে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।
এ ব্যপারে সিলেট হাইওয়ে পুলিশের এসপি মো. রেজাউল করিম বলেন, অনেক সমস্যা আছে সিলেট ঢাকা মহাসড়কে। এখন খুব খারাপ অবস্থা সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের। আর বৃষ্টি হলে আরও খারাপ হয়ে পড়ে। তবে সবচেয়ে খারাপ দিক হচ্ছে মহাসড়কে প্রতিযোগিতা। ধীর গতির যান সড়কে চলাচল বন্ধ না হওয়া, ট্রাফিক আইন না মানা এসব কারনেই মূলত ঘটনাগুলো ঘটছে। তিনি বলেন, আমরা প্রায়ই জরিমানা করছি। গাড়ি আটক করছি। দেখা গেছে, চালকরা অনেক সময় আইন মানে না। তারা অনেকেই প্রশিক্ষিত চালকও না। এটা থেকে বের হতে না পারলে মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব না।
বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন