কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:৫২
জগন্নাথপুর বাস মালিক সমিতির সভাপতির পদ দখলকে কেন্দ্র করে সিলেটের কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে জকিগঞ্জ-জাফলং রুট এবং মিতালি পরিবহন, হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস ও জগন্নাথপুর রুটের শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে বলে নেপথ্যের কারণ জানা গেছে। পরিবহন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, জগন্নাথপুর বাস মালিক সমিতির সভাপতি ছিলেন বিশ্বনাথ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম সোহেল চৌধুরী।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বিএনপির এক মিছিলে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার মৃত্যুর পর জগন্নাথপুর বাস মালিক সমিতির বর্তমান কমিটির সভাপতির পদ শূন্য হয়ে পড়ে। বর্তমানে ওই পদে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন ফারুক মিয়া। কিন্তু ওই সভাপতির পদে শাহজাহান মিয়া দায়িত্ব নিতে চাইলে বাস টার্মিনালে উত্তেজনা থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে।
পরিবহন সূত্র জানায়, জগন্নাথপুর বাস মালিক সমিতির একজন সাধারণ শ্রমিক ছিলেন শাহজাহান মিয়া। আবার তার প্রায় ২০টি বাস ওই রুটে নিজের মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি সোহেল চৌধুরী মারা গেলে শাহজাহান মিয়া সভাপতির পদে বসতে তৎপর হয়েছেন। তিনি এখন আর শ্রমিক সমিতিতে থাকতে রাজি নন। তাই তিনি শ্রমিকের কার্ড জমা দিয়ে মালিক সমিতিতে আসতে চাচ্ছেন। সম্প্রতি শাহাজাহন মালিকদের একটি গ্রুপ নিয়ে মিটিং করে সভাপতি হতে তৎপরতা শুরু করেন। এদিকে, শাহজাহানকে মানতে রাজি নন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফারুক মিয়া গ্রুপ। তাদের অভিযোগ, মালিক সমিতির নেতা সোহেল চৌধুরীর মৃত্যুর চল্লিশ দিনও হয়নি, শূন্য পদ দখলে নিতে মরিয়া হয়ে পড়েন শাহজাহান। তাই তার ওপর বর্তমান কমিটির অধিক্ংাশ নেতারাই নারাজ।
মালিক সমিতির সূত্র আরও জানায়, বর্তমান জগন্নাথপুর বাস মালিক সমিতির কমিটির মেয়াদ আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত মেয়াদ রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, বর্তমান মালিক সমিতি চাইলে ওই শূন্য সভাপতির পদে ক’অপ্ট করে সংগঠনের কাউকে সভাপতির পদে বসাতে পারেন। সে অনুসারেই, বর্তমান কমিটির অনেকেই প্রথমে ফজর আলীকে সভাপতি করার প্রস্তাব করেছিলেন, তবে ফজর আলী নিজে থেকেই সভাপতি হতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
সূত্র আরও জানায়, বর্তমানে মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি সোহেল চৌধুরীর স্মৃতি রক্ষার্থে ওই কমিটিতে তার পরিবারের একজন (ভাই সুমন চৌধুরীকে) সম্মানিত করতে সভাপতির পদে ক’অপ্ট করে আনতে তৎপর হয়েছেন। ইতিপূর্বে সুমন চৌধুরীকে কয়েকটি বাসের মালিকানা দেওয়া হয়েছে, এবং বর্তমান মালিক সমিতির সিংহভাগই অপেক্ষায় আছেন সুমন চৌধুরীকেই তার মরহুম ভাই সোহেল চৌধুরীর সভাপতির চেয়ারে বসাবেন। বিএনপির একজন শীর্ষ উপদেষ্টা পর্যায়ের কেন্দ্রীয় এক নেতা (বিশ^নাথ বাড়ি) তিনিও সুমন চৌধুরী গ্রুপের পক্ষে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে জানা গেছে।
পরিবহন সূত্র বলছে, জগন্নাথপুর বাস মালিক সমিতির সভাপতি পদ কোনোভাবেই শাহজাহানকে না-দিতে বর্তমান কমিটির অনেক নেতাই একজোট হয়েছেন। এদিকে, শাহজাহান সভাপতির পদ দখল করতে শ্রমিকদের একটি গ্রুপকে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। এরই প্রেক্ষিতে, সোমবার (২৭ এপ্রিল) দুপুর ২টার দিকে সিলেটের কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে জকিগঞ্জ-জাফলং রুট এবং মিতালি পরিবহন, হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস ও জগন্নাথপুর রুটের শ্রমিকদের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এ সংঘর্ষের পর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সোহেল চৌধুরী পরিবারের পক্ষের নেতাদের অভিযোগ হচ্ছে, শাহজাহান সভাপতির পদ নিতেই পরিকল্পিতভাবেই জকিগঞ্জ ও জাফলং রুটের বাস শ্রমিকদের নিয়ে জগন্নাথপুর বাস মালিক সমিতির কাউন্টার দখলে হামলা চালান। প্রতিহত করতেই জগন্নাথপুর রুট ও মিতালি বাসের শ্রমিকরা পাল্টা হামলা চালায়। এদিকে, শাহজাহান পক্ষের অভিযোগ হচ্ছেÑ বর্তমান কমিটি চাঁদাবাজি করতেই সভাপতি পদে নির্বাচন দিতে চাচ্ছে না। তাদেরকে বিএনপির কেন্দ্রীয় এক উপদেষ্টা শেল্টার দিচ্ছেন। তাই তারা বেপরোয়াভাবে শাহজাহান পক্ষের শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়।
মালিক সমিতির সূত্র আরও জানায়, সোমবার সংঘর্ষের পর টার্মিনালে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এ ঘটনার জের বিভিন্ন মালিক সমিতি ও পরিবহন শ্রমিক সমিতির নেতাদের ঘিরে ঘটনার রেশ প্রবাহিত হচ্ছে। যদিও সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী আপাতত উত্তেজনা প্রশমিত করেছেন, তবুও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে এখনও জগন্নাথপুর বাস মালিক সমিতির নেতাদের মধ্যে ভিতরে উত্তেজনা চলছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতিও চলমান বলে জানা গেছে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে সিলেটের শীর্ষ বিএনপি নেতারা ঘটনার মীমাংসা টানতে পারেন বলে হানা গেছে। তবে, বিএনপির উপদেষ্টা গ্রুপের বিপক্ষে কদমতলী বাস টার্মিনালের মোটা দাগের একটি পরিবহন শ্রমিক গ্রুপ অবস্থান নিয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু অন্য পরিবহন বাস মালিক ও পরিবহন শ্রমিক নেতারা সোহেল চৌধুরীর প্রতি সম্মান রেখেই বিষয়টি জগন্নাথপুর বাস মালিক সমিতির গঠনতন্দ্র অনুযায়ী সভাপতির দ্বন্দ্ব নিরসনের দিকে হাঁটছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
জগন্নাথপুর বাস মালিক সমিতির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফারুক মিয়া বলেন,‘ আমাদের সাবেক সভাপতি মরহুম সোহেল চৌধুরী মারা গেলে সভাপতি পদটি শূন্য হয়ে যায়। এই পদে এখন আমরা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সর্বসম্মতিতে সোহেল চৌধুরী পরিবারের একজন সদস্য সুমন চৌধুরীকে ক’অপ্ট করে আনতে চাচ্ছি। কিন্তু শাহাজাহন তা মানতে রাজি নন, তিনি সভাপতির চেয়ার দখল করতে কাউন্টারে হামলা চালান।’
অভিযোগ অস্বীকার করে জগন্নাথপুর বাস মালিক শাহজাহান মিয়া বলেন,‘ আমি আগে শ্রমিক সমিতিতে ছিলাম, তবে আমার জগন্নাথপুর রুটে নিজস্ব বাস রয়েছে। বর্তমানে আমি মালিক সমিতির সভাপতি পদে নির্বাচন চাচ্ছি। কিন্তু সংবিধান না মেনে জোরপূর্বক ওই পদ বিএনপির এক নেতার ইশারায় সোহেল চৌধুরীর ভাইকে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এর জেরে কিছু সন্ত্রাসীরা জগন্নাথপুর বাস কাউন্টারে হামলা চালায়, আমার শ্রমিকরা এর প্রতিবাদ করেছে।’
এ বিষয়ে সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হাসনাত আবুল বলেন,‘ মালিক সমিতির সভাপতির পদ নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা চলছে।’
এ বিষয়ে সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সিনিয়র নেতা রুনু মিয়া বলেন,‘ সোহেল চৌধুরী মারা গেলে সভাপতির পদে শাহজাহান জোরপূবর্ক আসতে চাচ্ছেন, তা মালিক সমিতির অনেকেই মানতে নারাজ। এ নিয়েই তাদের দুই গ্রুপে সংঘর্ষ ঘটে।’
সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ইসলাম বলেন, আপাতত ঘটনা শান্ত আছে। সিসিক প্রশাসক কাইয়ুম চৌধুরী দায়িত্ব নিয়েছেন। পরে বৈঠক করে সমাধান হবে। জগন্নাথপুর বাস মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি মরহুম সোহেল চৌধুরীর পদটি নিয়ে সকলেই চাচ্ছেন সকলের ঐক্যমতে একজনকে সভাপতি দিবেন, কিন্তু শাহজাহান মিয়া সভাপতির পদে জোরর্প্বূক বসা নিয়েই মূলত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।’
উল্লেখ্য, জগন্নাথপুর বাস মালিক সমিতির বর্তমান কমিটির মেয়াদ ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আছে। এই কমিটি কোরামের ভিত্তিতে সংবিধান অনুসারে সভাপতির পদে ক’অপ্ট প্রক্রিয়া করতে পারে। কিন্তু পরিবহন আইন অনুযায়ীÑ কেউ মালিক সমিতির সভাপতি হতে হলে কমপক্ষে দুই বছর সময় ধরে বাসের মালিক থাকতে হবে।
বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন