বিশেষ প্রতিবেদন

ভারতীয় পশু বিক্রির পথ খোলা রাখতে মরিয়া সিন্ডিকেট

মন্ত্রীর ঘোষণা ‘সীমান্ত এলাকায় বসবে না হাট’ 

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ ১৫:১০

ঈদুল আজহার আগে সরকার সীমান্ত এলাকার হাটে কুরবানির পশু বেচাকেনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ গত রবিবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সীমান্ত এলাকার কোনো হাটে এবার পশু বেচাকেনার অনুমতি দেওয়া হবে না। 


তাঁর মতে, প্রতিবছর ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে গরু আসায় স্থানীয় খামারিরা লোকসানে পড়েন; এবার সেই পরিস্থিতি তৈরি হতে দেওয়া হবে না।


কিন্তু মন্ত্রীর এই ঘোষণা কানে পৌঁছানোর পরপরই সক্রিয় হয়ে উঠেছে সিলেটের গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাটের সীমান্তবর্তী সিন্ডিকেট। 


অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তারা যেকোনো মূল্যে হাট ধরে রাখতে এবং ভারতীয় পশু বিক্রির পথ খোলা রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। 


কুরবানি ঈদকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই সিলেটের সীমান্ত এলাকার হাটে ভারতীয় গরু-মহিষ প্রবেশ করছে। বিজিবির স্থানীয় ক্যাম্পের অসাধু কর্মকর্তা, বিজিবি লাইনম্যান ও জেলা পুলিশের বিট কর্মকর্তারা মহিষ চোরাচালানে জড়িত বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। প্রতিদিন গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্ত দিয়ে এসব পশু স্থানীয় গরুর হাটে জমা হচ্ছে। পরে বাজারের অবৈধ রশিদ দিয়ে ডিআই পিকআপ ও ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে।


অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গোয়াইনঘাট উপজেলার রাধানগর বাজারের গরুর হাট, তোয়াকুল বাজারের গরুর হাট এবং জৈন্তাপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের হরিপুর বাজারের হাটে ভারতের গরু-মহিষ অনায়াসে প্রবেশ করছে। হাদারপার বাজার মামলা-সংক্রান্ত জটিলতায় উপজেলা প্রশাসন বন্ধ করে রাখলেও সেখান দিয়েও চোরাই পথে আনা পশু সিলেট হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠাচ্ছে চোরাকারবারিরা।


রাধানগর বাজারে গরু হাটের ইজারা দিয়েছে গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদ। সীমান্তে প্রবেশ করা গরু-মহিষ প্রথমে এই বাজারে জমা হচ্ছে। সেখান থেকে বৈধ বাজারের রশিদ লিখে একটি সিন্ডিকেট অবৈধভাবে ভারতের মহিষকে 'দেশীয় পশু' হিসেবে বৈধতা দিচ্ছে। পরে গোয়াইনঘাট পুলিশ ও জৈন্তাপুর পুলিশকে ম্যানেজ করে সিলেটের রুট হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের জেলা শহরে পাঠানো হচ্ছে।


জানা গেছে, জাফলংয়ের দুই প্রবেশমুখ মান্নান ও শ্যাম কালার নিয়ন্ত্রণে। সীমান্ত সূত্র জানিয়েছে, পূর্ব ও পশ্চিম জাফলং দিয়ে ভারতের মহিষ চোরাচালান হচ্ছে। পূর্ব জাফলং সীমান্তে মান্নান মেম্বারের বিজিবি লাইনের মাধ্যমে মহিষের পাশাপাশি ভারতের কসমেটিকস ও জিরা প্রবেশ করছে। তাঁর সঙ্গে জেলা ডিবি ও জাফলং বিট পুলিশের সম্পর্ক রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। 


পশ্চিম জাফলং সীমান্তে শ্যাম কালা নামের ব্যক্তি বিজিবিকে ম্যানেজ করে মহিষ এবং ভারতের চা, শাড়ি ও কসমেটিকস পাচার করছে। সীমান্তে বিজিবি ম্যানেজ হওয়ার কারণে প্রতি রাতে বড় বড় চালানের সঙ্গে মহিষও ঢুকছে। পরে গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর থানা পুলিশ এবং জেলা ডিবি পুলিশকে ম্যানেজ করে সীমান্তের হাটে প্রবেশ করানো হচ্ছে সেই মহিষ।


সিলেট সীমান্ত এলাকায় মহিষের কোনো খামারি নেই। অথচ হরিপুর বাজারে দেশি মহিষ বলে রশিদ দেওয়া হচ্ছে। সেই রশিদের মহিষই মোগলাবাজার থানায় গিয়ে আটক হচ্ছে। 


সম্প্রতি এসএমপির মোগলাবাজার থানা পুলিশ ১৪টি মহিষ আটক করে। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়, এগুলো ভারতীয় প্রজাতির। পরে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয় এবং আদালত মহিষগুলো মাত্র ২৪ হাজার টাকায় নিলামে বিক্রি করে সেই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করেন।


হরিপুর বাজারে 'দেশি মহিষ' বলে যেসব রশিদ দেওয়া হচ্ছে, সেই একই মহিষ মোগলাবাজার থানায় গিয়ে আটক হওয়ায় প্রমাণ করে যে হাটের ইজারাদার সরাসরি অবৈধ পশু বিক্রিতে সহায়তা করছেন।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিজিবির পাশাপাশি গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ, কিছু সীমান্ত বিট অফিসার প্রতি রাতে চোরাচালানের টাকার ভাগ পান। একইভাবে লাইনম্যানের মাধ্যমে জৈন্তাপুর থানা পুলিশ হরিপুর পুলিশ ফাঁড়ির চেকপোস্ট খুলে দিয়েছে। সে কারণে ওই রুটে প্রতি রাতেই ডিআই পিকআপভ্যানে ভারতের মহিষ সিলেটের পথে যেতে দেখা যায়।


এসএমপি কমিশনার চোরাচালান প্রতিরোধে কড়া নির্দেশ দিলেও বাস্তবে তা মানছেন না অসাধু পুলিশ কর্মকর্তারা। বিশেষ করে শাহপরাণ থানার দাসপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির, উপশহর পুলিশ ফাঁড়ি ও মোগলাবাজার থানার আলমপুর এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার যোগসাজশে হরিপুর হাটের অবৈধ রশিদে ভারতের গরু-মহিষ ও চোরাচালান পণ্য পাচার হচ্ছে। জালালাবাদ থানার শিবের বাজার পুলিশ ফাড়িকে ম্যানেজ করে বাদাঘাট রুটেও প্রতিদিন পশু ও চোরাই পণ্য সিলেটে প্রবেশ করছে।


সিলেট জেলা ডিবি পুলিশ চাইলেই চোরাচালানের গাড়ি আটক করতে পারে। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে তাদের তৎপরতা অনেকটা কমে গেছে। অফিসে বসেই লাইনম্যানের মাধ্যমে নিজেদের 'ভাগ' তুলে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।


জৈন্তাপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে বিজিবির সঙ্গে সিদ্ধান্ত হয়েছে ভারতীয় পশু বিক্রি করলে ইজারা শর্ত লঙ্ঘনের দায়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কমকর্তা রতন কুমার অধিকারী বলেন, হাদারপাড় বাজার বন্ধ; রাধানগর ও তোয়াকুল বাজারে হাট বৈধভাবে বসছে, তবে ভারতের পশু বিক্রির খবর পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নুরের জামান চৌধুরী বলেন, হাটগুলো দেখবে উপজেলা পরিষদ; সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ ঠেকাবে বিজিবি। তারা আটকাতে পারলে বিক্রির সুযোগ নেই।


সিলেটের বিজিবি ৪৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক বলেন, মন্ত্রীর সিদ্ধান্তের পাশাপাশি এটা বিজিবির রুটিন কাজ। কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে শুধু গরু-মহিষ প্রবেশই নয়, দেশের চামড়া পাচারেও বিজিবি কড়া নজরদারির ব্যবস্থা নিয়েছে। 


তিনি স্বীকার করেন, বিজিবি ভারতের চোরাচালান পণ্যসহ গরু-মহিষও আটক করছে; কিন্তু অনেক সময় বিজিবিকে ফাঁকি দিয়ে কিছু পশু প্রবেশ করে। সীমান্ত অনুপ্রবেশ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়না। তবে বাহিনির কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নিয়ম রয়েছে। 


কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সীমান্তে পশু চোরাচালানের এই রমরমা ব্যবসা বন্ধ করতে শুধু মন্ত্রীর ঘোষণা যথেষ্ট নয়। দরকার বিজিবি, পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বিত ও সৎ তৎপরতা। যে অসাধু কর্মকর্তারা রাতের আঁধারে চোরাচালানের ভাগ নিচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয় বলে এলাকার লোকজন জানিয়েছেন।

বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন


 শিরোনাম
news icon সিলেটে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অরাজকতা  news icon নগর ভবনের সামনে থালা হাতে হকারদের ধর্মঘট news icon নগর ভবনের সামনে হকারদের অবস্থান ধর্মঘট news icon হবিগঞ্জে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, নিহত বাবা ও ছেলে news icon টেকসই আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে দুর্যোগকালে মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হবে: প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী news icon টোকেনে শেষ সারাদিনের উপার্জন news icon গোয়াইনঘাটে গভীর রাতে ঘরে দুর্বৃত্তদের হানা, ছুরিকাঘাতে বৃদ্ধার মৃত্যু news icon বিছানাকান্দিতে পানিতে ডুবে নিখোঁজ শাবি শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার news icon চামড়া শিল্পকে বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়কারী খাত হিসেবে গড়ে তোলা হবে news icon ভারতীয় গরুর রমরমা বাণিজ্য সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী পশুর হাটে