সিলেট

ছয় বছরে উৎপাদন এক শতাংশ

৬০০ কোটি খরচেও অচল শাহজিবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্র

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ ০৩:০৮

‎৮৯০ কোটি টাকার প্রকল্পে ইতোমধ্যে ৬০০ কোটিরও বেশি টাকা পরিশোধ হয়ে গেছে ঠিকাদারের পকেটে, অথচ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি থেকে গত ছয় বছরে জাতীয় গ্রিডে গেছে মাত্র ৩৪ কোটি টাকার বিদ্যুৎ। হবিগঞ্জের শাহজিবাজারে স্থাপিত ১০০ মেগাওয়াট গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্রটির এই করুণ পরিণতি দেশের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিহীনতার এক উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

‎২০১৭ সালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এই কেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু করে। ঠিকাদার হিসেবে নির্বাচিত হয় চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না ক্যাবল কর্পোরেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (সিসিসিই) লিমিটেড। মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট জেনারেল ইলেকট্রিকের LMS100 মডেলের অ্যারো-ডেরিভেটিভ গ্যাস টারবাইন বসানো হয় এই কেন্দ্রে, যা বিশ্বের অন্যতম উন্নত প্রযুক্তি হিসেবে পরিচিত। চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের জুনে উৎপাদনে যাওয়ার কথা ছিল কেন্দ্রটির।

‎কিন্তু ২০২০ সালের মার্চে কোভিড-১৯ মহামারি শুরু হলে জেনারেল ইলেকট্রিকের বিশেষজ্ঞ দল দেশ ছেড়ে চলে যান, পিছিয়ে পড়ে নির্মাণকাজ।
‎মহামারি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে পরীক্ষামূলকভাবে কেন্দ্রটি চালু করা হয়। কিন্তু নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা (আরটিআর) সম্পন্ন হওয়ার পরপরই চলন্ত অবস্থায় গ্যাস টারবাইনের ব্লেড ভেঙে যায়। মেরামত শেষে ওই বছরের ২৯ অক্টোবর আবারও চালু করা হলে আবারও দেখা দেয় যান্ত্রিক ত্রুটি।

‎এরপর পুরো ‘সুপার কোর মেশিন’ পরিবর্তন করে আনা হয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে উৎপাদনে যায় কেন্দ্রটি। মাত্র দুই মাস ভালোভাবে চলার পর ২৯ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে আবারও একই পরিণতি  আবারও ভেঙে পড়ে টারবাইনের ব্লেড। তারপর থেকে কেন্দ্রটি পুরোপুরি অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে।

‎পরিকল্পনা অনুযায়ী এই কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৪ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হওয়ার কথা ছিল, যার আর্থিক মূল্য দৈনিক প্রায় ২ কোটি টাকা। সময়মতো উৎপাদনে যেতে পারলে গত ছয় বছরে এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা ছিল। বাস্তবে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সরবরাহ হয়েছে মাত্র ৩৪ কোটি টাকার বিদ্যুৎ  লক্ষ্যমাত্রার এক শতাংশেরও কম।

‎আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ইতোমধ্যে মোট বিলের প্রায় ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬২৩ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। কাজ সম্পূর্ণ না হওয়া সত্ত্বেও এই বিশাল অঙ্কের অর্থ পরিশোধ কীভাবে হলো-সেই প্রশ্নের সদুত্তর পিডিবির কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ক্ষতিপূরণ বাবদ আটকে রাখা ১০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৯০ কোটি টাকা সমন্বয় করার কথা বলছে পিডিবি, তবে সেটি কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

‎কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপক এ কে মফিজউদ্দিন আহমেদ ও প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আবদুল মান্নান স্বীকার করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রটির কার্যক্রম ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে।

‎প্রধান প্রকৌশলী মান্নান বলেন, ‘পিডিবি যেহেতু ইনভেস্ট করে ফেলেছে এবং পেমেন্টের ৭০ ভাগ দেওয়া হয়ে গেছে, সে হিসেবে পিডিবি অবশ্যই এটা চালু করবে স্কেপ করবে না।’ তিনি আরও জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রটি চালুর উদ্যোগ নিতে পারে এবং সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হবে না বলেও তিনি মনে করেন।

‎বর্তমানে প্লান্ট মেরামতের জন্য চীনা প্রতিষ্ঠান সিসিসিই এবং মার্কিন প্রতিষ্ঠান জেনারেল ইলেকট্রিকের সঙ্গে আলোচনা চলছে। যন্ত্রাংশ মেরামত ও প্রযুক্তিগত সহায়তার বিষয়ে এই আলোচনা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। 

‎সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালের জুন নাগাদ কেন্দ্রটি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে এর আগেও একাধিকবার সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল এবং প্রতিবারই তা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এবারের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সিলেট থেকে আরো পড়ুন