# মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬২ জন
# টিকা কাভারেজে ঘাটতি
# প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান
সিলেটের হাসপাতালগুলোতে এখন এক অদ্ভুত নীরব আতঙ্ক। শিশুদের কান্নার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে তরুণদের কাশি, জ্বর আর ফুসকুড়ির যন্ত্রণা। হামÑযে রোগকে এতদিন শিশুদের সীমাবদ্ধ দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখা হতো, তা এখন প্রাপ্তবয়স্কদেরও গ্রাস করছে। আর এই ভয়াবহতার প্রতীক হয়ে উঠেছে এক শিক্ষানবিশ নার্সের মৃত্যু। হাসপাতালের করিডরে সহকর্মীদের চোখের জল যেন বলে দিচ্ছে, এই রোগ আর বয়সের সীমারেখা মানছে না।
সিলেট বিভাগে হাম ও রুবেলার প্রাদুর্ভাব ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। শিশুদের পাশাপাশি এবার প্রাণ কেড়ে নিল এক তরুণীর জীবন। মাত্র ২২ বছর বয়সী শিক্ষানবিশ নার্স জেসমিন সুলতানা হামের উপসর্গে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের এই তরুণীর মৃত্যু যেন এক অকাল ঝরাপাতাÑযেখানে সেবাদানের স্বপ্ন থেমে গেল হাসপাতালের বিছানায়।
অথচ কয়েক সপ্তাহ আগেও তিনি ছিলেন হাসপাতালের প্রাণবন্ত মুখ। রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে নিজেই আক্রান্ত হন হামে। চিকিৎসার চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানতে হয়। সহকর্মীরা বলছেন, তিনি হয়তো টিকা পাননি। তার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য সতর্কবার্তাÑহামকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
শিশু থেকে তরুণ সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে এখন ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীর উপস্থিতি বাড়ছে। আগে হামকে শিশুদের রোগ বলা হলেও এখন তা তরুণদেরও আক্রান্ত করছে। জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া আর শরীরে ফুসকুড়িÑএই উপসর্গগুলোতে ভরে উঠছে হাসপাতালের ওয়ার্ড।
শিশু চিকিৎসক জাহান আহমেদ পরাগ বলেন, হাম একটি ভাইরাল সংক্রমণ যা রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। ভিটামিন-এ এর ঘাটতি দেখা দেয়, ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, বড়দের ক্ষেত্রে জটিলতা তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারেÑনিউমোনিয়া, ডিহাইড্রেশনসহ নানা জটিলতা তৈরি হয়। অনেক রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মাহবুবুর রহমান জানান, পরিস্থিতি নজরদারিতে রয়েছে। টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বড়রা আক্রান্ত হতে পারেন, বিশেষ করে যারা নিয়মিত আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকেন। ডায়াবেটিস, অপুষ্টি বা শৈশবে টিকা না নেওয়া থাকলে ঝুঁকি বাড়ে। নার্সের মৃত্যু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি একটি বিরল ঘটনা হলেও সতর্কতা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রত্যন্ত অঞ্চল ও নগরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সময়মতো টিকা না পাওয়ার প্রবণতা সংক্রমণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। অনেক পরিবার টিকার গুরুত্ব বোঝে না, আবার অনেকেই টিকা নিতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে। ফলে টিকাদান কর্মসূচি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
নার্সের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñহাম শুধু শিশুদের নয়, বড়দের জীবনও কেড়ে নিতে পারে। প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারে শোকের ঢেউ তোলে, সমাজকে কাঁপিয়ে দেয়। চিকিৎসকেরা বলছেন, প্রতিরোধের একমাত্র উপায় টিকা। তাই শিশুদের পাশাপাশি বড়দেরও টিকার আওতায় আনা জরুরি।
এদিকে সিলেট বিভাগে হাম ও রুবেলার প্রাদুর্ভাব ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম-রুবেলা সন্দেহে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন আরও ৬৭ জন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৬৫ জন রোগী। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৯৯ জন এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭০ জন রোগী চিকিৎসাধীন।
চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১৬৫ জন। সুনামগঞ্জে ৪৩ জন, সিলেটে ৪২ জন, হবিগঞ্জে ২১ জন এবং মৌলভীবাজারে ১৬ জন। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে ৫৮ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে হাম ও রুবেলা সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২ জনে।
বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন