বিশেষ প্রতিবেদন

জীবিকার তাগিদে পেশা বদলাচ্ছেন হাওরপারের মানুষ

ফসলহানি ও মৎস্য সংকটের মুখে হবিগঞ্জ

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ ১৬:১৬

ফাইল ফটো

এক সময় কৃষিকাজ ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন হাওর-বাঁওড়বেষ্টিত জেলা হবিগঞ্জের সিংহভাগ মানুষ। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে মানে এই অঞ্চলেে কোথাও ধান কাটা আবার কোথাও মাছ ধরার উৎসব চলতো। সম্প্রতিকালের ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যায় হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ধান। একই সঙ্গে কমে গেছে মাছের প্রাপ্যতাও। ফলে জীবিকার দ্বিমুখী সংকটে পড়ে জীবিকা তাগিদে বিকল্প কাজের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছেন অনেক কৃষক ও জেলে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৪৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় ১৪ হাজার ৬০১ হেক্টর, বানিয়াচংয়ে ৩৩ হাজার ৭০৫ হেক্টর এবং লাখাইয়ে ১১ হাজার ২০৮ হেক্টর জমিতে চাষ হয়। তবে বৈশাখ মাসের টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে যায়।

তবে কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। তাদের ভাষ্য, সরকারি হিসাবের অন্তত দ্বিগুণ জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হাওরপারের কৃষকদের অনেকেই বলছেন, একমাত্র ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বছরের খাদ্য নিরাপত্তা ও সংসারের ব্যয় মেটানো নিয়ে তারা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। ধান ঘরে তোলার ব্যস্ততা না থাকায় অনেক কৃষক এখন কর্মহীন সময় কাটাচ্ছেন।

বানিয়াচং উপজেলার কৃষক আলতাব মিয়া বলেন, “আমরা কৃষক মানুষ। কৃষিকাজ করেই সংসার চালাই। এবার হাওরে ১২ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলাম। দুই বিঘার ধান কোনোভাবে ঘরে তুলতে পেরেছি, কিন্তু ১০ বিঘার ফসল পানির নিচে চলে গেছে। এখন সংসার চালানোর জন্য বিকল্প কাজ খুঁজতে হচ্ছে।”

একই এলাকার কৃষক ছালেক মিয়া বলেন, সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে তার পাঁচ বিঘা জমির পুরো ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে এখন শহরে রিকশা চালাচ্ছেন তিনি।

ফসলহানির পাশাপাশি হাওরে মাছের সংকটও বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে নতুন পানি এলেই হাওরে মাছ ধরার প্রতিযোগিতা শুরু হতো। অনেক পরিবার মাছ বিক্রি করে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি নিজেদের খাদ্য চাহিদাও মেটাতে পারত। কিন্তু এখন সেই সুযোগ অনেক কমে গেছে।

জেলে হরিধন দাস বলেন, “আগে শুধু মাছ ধরেই সংসার চলত। এখন মাছের এত সংকট যে, অনেক দিন ২০০ টাকার মাছও বিক্রি করতে পারি না। বাধ্য হয়ে ছেলেকে শহরের একটি কোম্পানিতে চাকরির জন্য পাঠিয়েছি। শুধু আমি নই, আমার মতো অনেক পরিবারের ছেলেমেয়েরা এখন কাজের খোঁজে শহরে যাচ্ছে।”

স্থানীয় জেলেদের মতে, হাওরের নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছের স্বাভাবিক আবাসস্থল কমে গেছে। এর সঙ্গে কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার মাছের প্রজনন ক্ষেত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি চায়না জাল, কারেন্ট জাল ও বেড় জালের মতো নিষিদ্ধ সূক্ষ্ম জালের মাধ্যমে নির্বিচারে মাছের পোনা ধরার কারণে মাছের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একসময় যে হাওর মাছের প্রাচুর্যের জন্য পরিচিত ছিল, সেখানে এখন জীবিকা নির্বাহ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে হবিগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরিফুল আলম বলেন, হাওরে মাছের উৎপাদন ও প্রজনন বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়মিত মাছের পোনা অবমুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।

বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন