সুরমার মরণদশা
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ ১৫:২৮
সিলেটের জীবনরেখা ও প্রাণের নদী সুরমা ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক রূপ ও যৌবন হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। বিগত ৪৩ বছরে নদীটির গড় প্রস্থ কমে গেছে প্রায় ৪০ মিটার। একই সময়ে নদীতে পলি জমার পরিমাণ ছিল ভাঙনের প্রায় দ্বিগুণ। পলি জমে তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীর গতিপথ, বাঁক ও স্বাভাবিক প্রবাহে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে।
গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, পাহাড়ি ঢলের অতিরিক্ত পলি, অবৈধ দখল, দূষণ এবং অপরিকল্পিত বালু-পাথর উত্তোলনের কারণে নদীটি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। নদীটি দ্রুত খনন করা না হলে সিলেট অঞ্চলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্যা দেখা দিতে পারে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের একদল গবেষকের করা ‘স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিলেট জেলার সুরমা নদীর গঠনগত পরিবর্তনের বিশ্লেষণ’ শীর্ষক এক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘আমেরিকান জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি’-তে প্রকাশিত এই গবেষণায় ১৯৭৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৪৩ বছরের স্যাটেলাইট চিত্র বা ডাটা নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে সুরমা নদীর গতিপথ, প্রস্থ, ভাঙন ও পলি জমাসহ সার্বিক গঠনগত পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালে সুরমা নদীর গড় প্রস্থ ছিল ১৬৩ দশমিক ২০ মিটার। কিন্তু ২০২১ সালে তা সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৩৪ দশমিক ৪৫ মিটারে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে নদীটির সংকোচন প্রবণতা স্পষ্ট। তবে এর মাঝে ১৯৯৯ সালে সুরমার গড় প্রস্থ নেমে গিয়েছিল মাত্র ৯৮ দশমিক ৬৫ মিটারে, যা ছিল নদীটির ইতিহাসের অন্যতম সর্বনিম্ন সংকোচন।
গবেষকেরা জানান, নদীটি ভাঙছে যতখানি, তার চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে ভরাট হচ্ছে। ৪৩ বছরে সুরমায় পলি জমেছে ৩ হাজার ১৫৭ দশমিক ৮৪ একর এলাকায়, বিপরীতে ভাঙনের শিকার হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬১৩ দশমিক ৭৭ একর ভূমি। মূলত ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে হওয়া ভয়াবহ বন্যাগুলোর সময় উজান থেকে আসা বিপুল পরিমাণ পাহাড়ি পলি নদীটির তলদেশে জমা হয় এবং ওই সময়েই সবচেয়ে বেশি পলি জমার ঘটনা ঘটে।
গবেষণায় সুরমা নদীর ১০টি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বা অংশ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কানাইঘাট, দক্ষিণ বানিগ্রাম ও লালারগাঁও এলাকায় নদীর গতিপথ সবচেয়ে বেশি বদলেছে। বিশেষ করে বলাউড়া বাজার এলাকায় নদীর বাম তীর ৬৬৩ দশমিক ৫১ মিটার এবং ডান তীর ৫৭২ দশমিক ৩৪ মিটার পর্যন্ত মূল অবস্থান থেকে সরে গেছে।
দেখা গেছে, নদীর বাম তীরে ক্ষয়ের প্রবণতা বেশি হলেও ডান তীরেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে এবং দুই তীরের এই পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে নদীটি দিন দিন সরু হয়ে পড়ছে। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত পলি জমার কারণে নদীটি এখন আরও বেশি আঁকাবাঁকা বা ‘মিয়ান্ডারিং’ চরিত্র ধারণ করছে।
১৯৭৮ সালে নদীর সামগ্রিক সিনুয়াসিটি ইনডেক্স (বাঁক পরিমাপের সূচক) ছিল ১ দশমিক ৬১, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৮৫-এ। এর ফলে পানির গতিপথ বারবার বদলে কোথাও তীব্র ভাঙন সৃষ্টি করছে, আবার কোথাও নদী ভরাট হয়ে নতুন চরের জন্ম দিচ্ছে।
গবেষকেরা সতর্ক করেছেন যে, সুরমা নদীর এই প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে সিলেট অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, নৌপথ, কৃষি, মৎস্য সম্পদ ও সামগ্রিক পরিবেশব্যবস্থার ওপর।
এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. বাহাউদ্দিন শিকদার বলেন, নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে কেউ চাষাবাদ করে আবার কেউ অবৈধভাবে নানাবিধ স্থাপনা গড়ে তোলার কারণে সুরমার প্রস্থ দিন দিন কমে যাচ্ছে। নদীকে রক্ষা করতে হলে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সরকারকে অবিলম্বে নদী থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে এবং নদীতে জমা হওয়া পলিগুলো নিয়মিত ড্রেজিং বা খনন কাজের মাধ্যমে অপসারণ করতে হবে।
যদি নদী থেকে দ্রুত পলি উত্তোলন করে গতিপথের প্রতিবন্ধকতা দূর করা না হয়, তবে সিলেট অঞ্চলের মানুষকে বিগত দিনের মতো বারবার ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যার মুখোমুখি হতে হবে। তাই সুরমা নদী রক্ষায় এখনই সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন